দৈনিক মতামত

প্রতিভা বিকাশের অন্যতম মাধ্যম

ইতিহাস

ইয়াহিয়া আয়াশ

ইয়াহিয়া আয়াশ
.
.
ইয়াহিয়া আয়াশ ছিলেন ফিলিস্তিনি সশস্ত্র সংগঠন হামাসের বোমা ও এর ডিজাইন তৈরি করার প্রধান ব্যাক্তি । বোমার বিশেষজ্ঞ হিসেবে ইয়াহিয়া আয়াশের কাজ ছিল হামাসের জন্য নিত্যনতুন বোমা তৈরি করা । তিনি এবং তার সহযোগীরা ঠিক এই কাজটিই করতেন যা ছিল হামাসের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ন ।

১৯৬৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ফিলিস্তিনের রাফাত শহরে ইয়াহিয়া আয়াশ জন্মগ্রহন করেন । তিনি তার ৩ ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় ছিলো । ইয়াহিয়া আয়াশের পুরো নাম ছিল ইয়াহিয়া আব্দ আল লতিফ আয়াশ ।
.


ছোটবেলা থেকে তাকে সকলে আয়াশ বলে ডাকতো । আর ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন অত্যান্ত ধার্মিক ।
আয়াশের একটি বিশেষগুন ছিল তিনি অত্যান্ত সুন্দর ও মার্জিত ভাষায় পবিত্র কোরআন শরীফ পড়তে পারতেন ।
.
.
ইয়াহিয়া আয়াশের ইচ্ছা ছিল উচ্চশিক্ষিত হবার কিন্তু তা ইসরাইলি বাধাতে হলো না । ৮০ এর দশকে তিনি হামাসের হয়ে কাজ শুরু করেন । তার একটি গুন ছিল তিনি খুব অল্প খরচে হামাসের জন্য অধিক শক্তিশালী বোমা তৈরি করতে পারতেন ।

ছবিতে ইয়াহিয়া আয়াশ ও তার মারা যাওয়ার পর তার লাশের পাশে লক্ষাধিক মানুষের ছবি

আয়াশের তৈরিকৃত বোমা ব্যবহার হতে লাগলো ইসরাইলি সেনাদের হত্যা করতে । অসংখ্য ইসরাইলি সেনার প্রান গেছে শুধুমাত্র আয়াশের তৈরিকৃত বোমার মাধ্যমে ।
আয়াশের বোমা তৈরির বিশেষগুন দেখে হামাস তাকে বোমা তৈরির প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেয় ।
এরপর ইয়াহিয়া আয়াশ একে একে ফিলিস্তিনির স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য অনেক বোমা তৈরি করেছিলেন ।

তার এসব তৈরিকৃত বোমার মাধ্যমে অনেক ইসরাইলি সেনার মৃত্যু হতে লাগলো ।
যা ইসরাইল কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলো না । ফলে ইয়াহিয়া আয়াশ কে হত্যার পরিকল্পনা করে ।
ইসরাইলের মন্ত্রীসভা দেশটির অভ্যান্তরীন গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেত কে এই কিলিং মিশনের দায়িত্ব দেয় ।
.
এখানে একটু বলে রাখি শিন বেত হচ্ছে ইসরাইলের অভ্যন্তরীন গোয়েন্দা সংস্থা যারা ইসরাইলের অভ্যন্তরের বিভিন্ন অপরাধ দমন করে পাশাপাশি ইসরাইলের স্বার্থে বাইরের দেশ অপারেশন পরিচালনা করে ।
শিন বেত কে আমাদের দেশের পুলিশের গোয়েন্দা সংস্থা স্পেশাল ব্রাঞ্চের বা SB(এসবি)সাথে তুলনা করতে পারেন ।
.
.
যাইহোক শিন বেত এর একজন এজেন্ট গভীর পর্যবেক্ষনের মাধ্যমে ইয়াহিয়া আয়াশের ছোটবেলার বন্ধু কামিল হামাদ কে খুজে পেল ।
১৯৯৫ সালে অক্টোবরে কোন এক ছুটিতে কামিল হামাদের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলো ইয়াহিয়া আয়াশ ।
.
.
বিষয়টি জানতে পেরে এই ঘটনার কয়েক দিন পর শিন বেতের এজেন্ট কামিল হামাদের সাথে দেখা করে বললো কামিল হামাদ যেন গোপনে তার বন্ধু আয়াশের মোবাইল ফোনটি ওই এজেন্টের কাছে নিয়ে আসে ।
.
কিন্তু লোভে পড়ে কামিল হামাদ তার এই কাজের জন্য শিন বেতের কাছে ১ মিলিয়ন ডলার ও যুক্তরাষ্ট্রে যাবার ভিসা চাইলো অতঃপর শিন বেত তার দাবি পূরন করলো ।

অন্যদিকে আয়াশের মোবাইল ফোন গোপনে এনে শিন বেতের কাছে দেয়ার পর এতে ১৫ গ্রাম ওজনের RDX বিস্ফোরক বসিয়ে দেয় ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থাটি ।
.
১৯৯৬ সালের ৬ জানুয়ারি ইয়াহিয়া আয়াশের বাবা তার কাছে ফোন করলে আয়াশের কথা বলার ধরন রেকর্ডারের মাধ্যমে শুনছিলো এবং কথা বলা ব্যাক্তিটি যে ইয়াহিয়া আয়াশ ছিল তা জানার ও নিশ্চিত হওয়ার পরেই রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে সুইচ চাপ দেয়ার সাথে এক বিস্ফোরনের মাধ্যমে মারা যায় ইয়াহিয়া আয়াশ ।
.
.
ঘটনার পর পর কামিল হামাদ ১ মিলিয়ন ডলার ও যুক্তরাষ্ট্রের পাসপোর্ট নিয়ে সে দেশে পাড়ি জমান ।
.
.
আর ঠিক এর মাধ্যমে শেষ হয়ে যায় ফিলিস্তিনিদের ইতিহাসে অন্যতম এক বীর মুসলিম সন্তানের । তার মৃত্যুতে গোটা ফিলিস্তিনে শোকের ছায়া নেমে আসে ।
আয়াশ কতটা জনপ্রিয় ছিলেন তা বোঝা যায় তার জানাযা দেখলে ।
আয়াশের জানাযাতে ১ লাখের বেশি মানুষ জানাযা পড়েছিলেন এবং তার জন্ম শহর রাফাতে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় ।
.
.
যদিও তার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে ৮ জন ইসরাইলি সেনা কে বোমা মেরে হত্যা করে হামাস । তবুও ২০০ জন ইসরাইলি সেনা মারলে কি ইয়াহিয়া আয়াশ ফিরে আসবে ! তার মৃত্যু ছিল গোটা ফিলিস্তিনি ও হামাসের জন্য এক অপূরনীয় ক্ষতি ।
.
এখনো ফিলিস্তিনির বিভিন্ন জায়গা তে বা সড়কে এই বীর মুসলিম সন্তানের স্মৃতি চিহ্ন করে রেখেছে সাধারন ফিলিস্তিনি নাগরিকরা ।

যদিও ইসরাইল তার গুপ্তহত্যা কখনোই স্বীকার করে না তবুও ২০১২ সালে শিন বেতের সাবেক পরিচালক গিলন স্বীকার করে নেন যে আয়াশের ছোটবেলার বন্ধু কামিল হামাদ যদি সহযোগিতা না করতো তাহলে ইয়াহিয়া আয়াশ কে হত্যা করা তাদের পক্ষে খুবেই কঠিন হতো ।
কারন আয়াশ খুবেই চালাক ও ছদ্মবেশী রূপ নিতে খুব দক্ষ ছিলেন ।

লেখেছেন@ফারহান জোবান(গবেষক ও ইতিহাসবিদ)

4 COMMENTS

LEAVE A RESPONSE

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।