দৈনিক মতামত

প্রতিভা বিকাশের অন্যতম মাধ্যম

ছোটগল্প

তবু দুই হাত দুইদিকে উঁচিয়ে(ছোটগল্প)নাসীমুল বারী

ছোটগল্প:-তবু দুই হাত দুইদিকে উঁচিয়ে
গল্পকার:- নাসীমুল বারী ।।

অনলাইনের এ সময়ে মোবাইল ফোন জানান দিয়েছে আজ ঢাকার তাপমাত্র বত্রিশ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
বত্রিশ ডিগ্রি !
মানে বেজায় গরম। অবশ্য এমন তাপমাত্রায় জাহেদের কিছু যায় আসে না। সে জিনসের মতো মোটা কাপড়ের ফুলহাতা জামা পরেছে। প্যান্টও তাই। ফুলহাতার উপর আবার শাদা সিনথেটিক কাপড়ের এক্সট্রা হাতাও লাগানো হয়েছে। মাথায় মোটা ক্যাপ। পায়ে মোটা ফুল মোজায় মোটা ও ভারি জুতো। প্রতিদিনেরই ড্রেস এটি জাহেদের। রোদ হোক, গরম পড়ুক- এ পোশাকের ব্যতিক্রম নেই।
বত্রিশ ডিগ্রি নয় বিয়াল্লিশ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলেও এ পোশাকই পরবে। এ পোশাকই তাকে পড়তে হবে। আজকের এই বত্রিশ ডিগ্রি তাপমাত্রায় এমন পোশাক নিয়ে সকাল থেকেই ঠায় দাঁড়িয়ে আছে চৌরাস্তার মধ্যখানটায়। এখন সূর্য মাথার ঠিক উপরে।
না, কোনো মানসিক বিকৃতির পাগল নয় জাহেদ। একদম সাচ্ছা-সচেতন ও দায়িত্ববান কর্মক্ষম মানুষ ট্রাফিক কনস্টেবল- জাহেদ হাওলাদার।
হঠাৎ সিগনাল অমান্য করে একটি ট্যাক্সি এগিয়ে যায়। আইল্যান্ড থেকে দ্রুত নেমে হুইসেল বাজিয়ে থামতে ইশারা দেয়। গাড়িটা একটু এগিয়ে থামায়। ড্রাইভার গ্লাস নামিয়ে মাথা বের করে একটু কড়া স্বরে বলে, কী হয়েছে?
-ড্রাইভিং লাইসেন্স দেখি।
-লাইসেন্স আছে। বের করতে হবে না।
-গাড়ির কাগজ বের করেন।
-বলছি তো সবই ঠিক আছে। জানেন এটা কার গাড়ি?
তারপরই ড্রাইভার গর্ব নিয়ে একজন ভিআইপি লোকের নাম বলে। সমাজের চেনা এ লোকের কথা শুনে জাহেদ পড়ে যায় অস্বস্তিতে। কী করবে? সিগনাল ছাড়ার সময় হয়ে গেছে। আর কোনো কথা না বলে দ্রুত ফিরে আসে ট্রাফিক আইল্যান্ডে। ডানের সিগনাল থামিয়ে সামনেরটা ছেড়ে দেয়।
হাত উঁচিয়ে আর হাতের ইশারায় সারাবেলা দাঁড়িয়ে থেকে এভাবেই ট্রাফিক সিগনাল নিয়ন্ত্রণ করে জাহেদ আর তার সহকর্মী রবিন। ক্লান্ত জাহেদ সিগনাল ভঙ্গ করা ভিআইপির গাড়ি নিয়ে মাথা ঘামাল না আর।
এমন গরম আর বৃষ্টিতে প্রতিদিনের দাঁড়িয়ে থাকা শারীরিক কষ্টই ওর পেশা। ক্লান্তি এলেও ক্লান্তি নেই। রোদ-বৃষ্টি, ঝড়-ধুলো কিংবা হিম-কুয়াশার কনকনে শীতেও ভ্রূক্ষেপ নেই। বসে বিশ্রামের সুযোগও নেই। ছায়াও নেই; আইল্যান্ডের টুকরো ছাউনিই ভরসা। তাও পুরোপুরি নয়; কখনো ছায়া রাস্তায় গিয়ে পড়ে। অর্থনীতি পরিভাষায় এটা সেবামূলক রাষ্ট্রিয় পেশা। রাষ্ট্রপ্রদত্ত রীতির কারণেই ওই মোটা পোশাক- কত ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা; সেটা ভাবার সময় কই?
ট্রাফিক আইল্যান্ডে দাঁড়িয়ে জাহেদ ভাবে, কী যে অবস্থা! ট্রাফিক আইন মানাতে না পারলে বস রাগ করেন। আবার এমন ভিআইপিদের গাড়ি ট্রাফিক আইন ভাঙছে অহরহ। তাদের ধরলেও নানা ঝামেলা তৈরি হয়। অনেক সময় চাকরির করুণ পরিণতি ঘটে। শাস্তিমূলক বদলি করে দেবে দেশের কোথায় না কোথায়, কে জানে? জীবনের অপরাহ্ন বেলায় হঠাৎ যদি এমন বদলিতে দূরে কোথাও পাঠিয়ে দেয়, তবে! ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার কী হবে? স্বল্প সময়ে সংসার বদলানোর অভ্যাস থাকলেও এখন ছেলে-মেয়েদের ঢাকায় হোস্টেলে রেখে লেখাপড়ার করানোর যে সাধ্য নেই।
ভয়ে গা শিহরিয়ে ওঠে জাহেদের।
না, ওই গাড়ির দিকেই আর তাকানো যাবে না। জামার ভেতর যে বৃষ্টির মতো ঘামের ধারা বইছে। প্রচণ্ড ব্যস্ত সড়কে বিশ্রামের ফুসরত নেই। তবু সিগনালিংটা রবিনের কাছে দিয়ে একটু বিশ্রাম নিতে ফুটপাতের দিকে যায়। ফুটপাতের এক পাশে একটা আধপুরোনো প্লাস্টিকের চেয়ার আছে, কে রেখেছে জানে না জাহেদ। ওটায় গিয়ে একটু বসবে।

ছবিতে:-বাংলাদেশ ট্রাফিক পুলিশ
ছবিতে:-বাংলাদেশ ট্রাফিক পুলিশ


-এই- এই…
দৌড়ে যায় জাহেদ। এ এক উটকো ঝামেলা। দুই তরুণি কথা নেই বলা নেই, রাস্তার মাঝ দিয়েই হাঁটা ধরেছে। দেখে বুঝা যায় তারা শিক্ষার্থী। গাড়ির গতি আটকে যাচ্ছে। দুর্ঘটনার আশঙ্কাও আছে; অথচ পাশে ফুটওভারব্রীজ- তারপরও রাস্তার মধ্যখান দিয়ে এলাপাতাড়ি পারাপার, কী যে সমস্যা! বেশি কিছু বললে আবার সাংবাদিকরা রিপোর্ট করবে নারীর প্রতি অবমাননা। হায় হায়… তখন চাকরি!
আবারও আঁতকে ওঠে জাহেদ।
দ্রুত গিয়ে অনুনয় করে তরুণি দুজনকে একপাশে সরিয়ে নিয়ে আসে। সমীহটা এতটাই নরোম ছিল, মনে হচ্ছে জাহেদই তাদের সরতে বলে অন্যায় করেছে। কিন্তু কিছু করার নেই। সাধারণ জনগণ- অনেক সময় এমন ভুল করতেই পারে। জাহেদদের ধৈর্য্য ধরতে হয় এসব ক্ষেত্রে। এটা তাই নিত্য দৃশ্য- শুধু মেজাজকে নিয়ন্ত্রণ করে সদাচরণ করতে হয়।
আবার এসে দাঁড়ায় ট্রাফিক আইল্যান্ডে। হামবড়া ভাব নিয়ে এক যুবক একটু চড়া মেজাজে ডাকে। রবিনকে সিগনালে দিয়ে তার কাছে যায়। জাহেদকে নিয়ে যুবকটি ফুটপাতে আসে। ওখানে আরেক যুবককে দেখিয়ে বলে, ওরে ফুটপাতে নাকি বসতে দেন না?
-হা।
-কেন?
-কেন আবার? রাস্তা জ্যাম লাইাগ্যা যায়। সহজ ব্যাপারটা বুঝেন না?
-বুঝি। এটা আমার লোক। আমি এখানকার হকার নেতা। সে বসবে এখানে। আপনাগো চা-নাস্তার পয়সা অইব। ঘরের বাজারের পয়সাও অইব।
জিহ্বাটা আধা বের করে আলতো কামড় দিয়ে জাহেদ বলে- ছি: ছি:…! আপনে আমারে এমনটা ভাবলেন?
-সরি। কিন্তু আমার লোক এখানে বসবেই। আর কোনো কথা শুনতে চাই না। আপনারটা নিবেন না ড্রেনে ফালাইবেন, সেটা আপনার বিষয়। আমার লোক কিন্তু বসবে।
-আমি পারব না। ওই যে স্যারের সাথে কথা বলেন।
অন্যপাশে হোন্ডায় ঠ্যাস দিয়ে দাঁড়ানো সার্জেন্টকে দেখিয়ে জাহেদ ফিরে আসে আইল্যান্ডে। এ সড়ক খুবই ব্যস্ত। সার্বক্ষণিক ট্রাফিক ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।
•••
সকাল থেকেই গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি। বাতাসও আছে। আজ রোদ নেই। নেই রোদের তেজও। শীতের আবহে মোটা কাপড়ে একটু আরাম বোধ করছে। আইল্যান্ডে আসতে না আসতেই বামের রাস্তায় ঝামেলা। এই বৃষ্টিতেও প্রতিযোগিতামূলক ওভারটেক করতে গিয়ে বাসে বাসে সংঘর্ষ লেগে যায়। প্রায় দৌড়ে যায় জাহেদ-রবিন সাথে সার্জেন্টও। বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছে। ছাতায় মাথা আর শরীরের উপরের অংশটাই বাঁচছে। বাতাসের ঝাটকায় বাকী শরীর-কাপড় ভিজে যাচ্ছে। মনে মনে ভবে জাহেদ, কী যে ঝামেলা! যাক আইল্যান্ডে গিয়ে দাঁড়ালে গায়েই শুকিয়ে যাবে।
সার্জেন্ট দুই বাসকেই রাস্তার পাশে সাইড করায়। জাহেদ কাগজপত্র নিয়ে দুই ড্রাইভারকেই নামতে বলে। কিন্তু ড্রাইভাররা নামতেছে না। একজন হাস্যোজ্জ্বল ভাব নিয়ে সার্জেন্টকে লক্ষ্য করে বলে- ওস্তাদ মাফ কইরা দেন। আমরা নিজেরা একটু মজা করছি। এক্সিডেন্ট-ফেক্সিডেন্ট হইত না। এমুন বড় রাস্তায় কি এক্সিডেন্ট অয়?
জাহেদ একটু চড়া গলায় বলে. কাগজ-পত্র লইয়া নাম তাড়াতাড়ি।
-আপনে ছোট ওস্তাদ। আপনে কথা কইয়েন না।
মুখের উপর এভাবে কথা- সার্জেন্টের মেজাজ চড়ে যায়।
এসব গাড়ি প্রভাবশালী শ্রমিক নেতাদের। ইচ্ছাকৃত দুর্ঘটনা মানুষ মারারই নামান্তর। আইনে কঠিন শাস্তি- অবশেষে সে দিকে যেতে দেয় নি দুই ড্রাইভার মিলে। এমন মামলা দিলে ধর্মঘটের হুমকিও দেয়। বাসের যাত্রিরা হই চই শুরু করেছে। ড্রাইভারদের ভ্রূক্ষেপে নেই সে দিকে। এক পর্যায়ে ড্রাইভারদের সাথে রফা হয় বড় কোনো মামলা না দেওয়ার ব্যাপারে। বাধ্য হয়েই ছোট এক মামলা ঠুকে দেন সার্জেন্ট।
জাহেদ ভাবে কী যে অবস্থা! শ্রমিক নেতা, ভিআইপি- এদের কাছে আইন যেন কিছুই না। তাদের দাপটই আইন! আর সমস্যা-বিপদ এসব আমাদের সাধারণ ট্রাফিকদের উপর দিয়ে বয়ে যায়। রোদ-গরম-বৃষ্টি কিংবা শীতের কনকনে আবহাওয়াতেও আমরা আইন শৃঙ্ক্ষলা রক্ষায় দাড়িঁয়ে থাকি। আর ওরা! আইনের একটা ছোট্ট প্রয়োগও আজ কাঠালের আমসত্ত্ব হয়ে গেছে।
আচমকা বৃষ্টি ভেজা দমকা একটা বাতাস বয়। ভেজা মোটা কাপড়েও কনকনে শীতে শরীরটা কাটা দিয়ে ওঠে।
জাহেদের কষ্টটা আজ একটু বেশিই মনে হচ্ছে। দাঁড়িয়ে থাকতে আর পা চলে না। তবু আইল্যান্ডে দাঁড়িয়ে নতুন সিগনাল দেয় দুই হাত দুইদিকে উঁচিয়ে।
#
১০ জুন ২০১৯

LEAVE A RESPONSE

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।