দৈনিক মতামত

প্রতিভা বিকাশের অন্যতম মাধ্যম

ধারাবাহিক-গল্প

বাবার বিয়ে(1-10 বাংলা গল্প)নুসরাত মাহিন

গল্পঃবাবার বিয়ে

গল্পকার :-নুসরাত মাহিন

১ম পর্ব:-

বাড়িতে উৎসব মুখোর পরিবেশ চারিদিকে লাল, নীল বাতি জ্বলছে। আজ আমার বাবার বিয়ে, হ্যা আমার বাবার দ্বিতীয় বিয়ে।

আমরা চার বোন থাকা শর্তেও ষাট বছর বয়সে বংশ রক্ষার করার জন্য বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করতে যাচ্ছে।
ছেলে সন্তান হলো বংশের প্রদীপ । মেয়ে সন্তান কখন বংশ রক্ষা করতে পারেনা তাই তারা বংশের প্রদীপ ও হতে পারেনা।

আমার মায়ের অপরাধ সে একটা ছেলে সন্তান জন্মদিতে পারেনি তাই বাবা ছেলে সন্তানের জন্য আর একটা বিয়ে করতে যাচ্ছে।

বাবা প্রথমে বিয়েতে রাজি ছিলনা পরে কি ভেবে রাজি হয়ে গেলো।

আমার চাচা, ফুফুরা মূল চক্রান্তকারী তারাই বাবাকে বিয়ের জন্য পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের এক কথা পোলা হইলো বংশের প্রদীপ। ভাইজান তুমি মারা গেলে যে কি হইবে। এত বিশাল সম্পত্তি জামাইরা লুইট্টা পুইট্টা খাইবে। তোমার নাম ডাক ধুলায় মিশে যাবে। আলী আহামেদ খন্দকারে নাম ডাক কিছু থাকবে না সব শেষ হয়ে যাবে।

আমরা কি সমাজে বাস করি ছেলে সন্তানেরা সম্পত্তি ভোগ করলে বাবার সম্মান বৃদ্ধি পায় আর কন্যা সন্তানেরা সম্পত্তি ভোগ করলে বাবার সম্মানহানি হয়। কন্যা সন্তানরা কি বাবার ঔরসের সন্তান না।

আমি বাবার সামনে বসে আছি বাবাকে আজ খুব খুশি দেখাচ্ছে। ধবধবে সাদা পাঞ্জাবী পরে আছে এখন সৌদিআরব থেকে আনা সুগন্ধী আতোর গায়ে মাখছে।
শুনেছি বাবা যাকে বিয়ে করবে সে আমার বড় আপার বয়সি। অনেক গরিব ঘরের মেয়ে বাবার সম্পত্তি টাকা পয়সা দেখে বিয়ে দিচ্ছে।

মা বলেছে এখন থেকে মা আমার সাথে থাকবে তাই মায়ের প্রয়োজনিয় জীনিসপত্র আমার রুমে এনে গুছাচ্ছে। মায়ের চোখ লাল হয়ে আছে মনে হয় অনেক কেঁদেছে।
ফুফুরা মায়ের রুমটা ফুল দিয়ে সাজাচ্ছে এখন থেকে নতুন মা ঐ রুমে থাকবে।

মা ও তো একদিন এমন ভাবে বউ সেঁজে এসেছিল বাবার ঘরে হয়তো মায়ের জন্য এভাবে বাসর ঘর সাজিয়েছিল। কিন্তু আজ মায়ের পঁয়ত্রিশ বছরের ভালোবাসার ইতি টানটে যাচ্ছে। মা কি জানতো এই বয়সে এসে তাকে সতিনের সংসার করতে হবে। আর যাই হোক কোন স্ত্রী চায়না তার ভালোবাসার ভাগ অন্যকে দিতে। আর আজ পৃথিবীর সব থেকে কঠিন কাজটি আমার মা করতে যাচ্ছে। তার ভালোবাসার মানুষটাকে, হাজারো কষ্টের মাঝে গড়ে তোলা সংসারটাকে অর্ধেক ভাগ দিতে হবে।

কপালের লিখন না যায় খন্ডন মায়ের ভাগ্যে হয়তো এটাই লেখা ছিল।

আমার চাচা,ফুফুরা চেয়েছিল তাদের গন্ডমূর্খ ছেলেদের সাথে আপুদের বিয়ে দিয়ে সবসম্পত্তি ভোগদখল করে খাবে কিন্তু মায়ের জন্য পারেনি। এই জন্য মায়ের উপর অনেক ক্ষোভ ছিল তাদের তাই তো বাবাকে কানপরামর্শ দিয়ে বিয়েতে রাজি করিয়েছে। আর বাবাও পুত্র সন্তানের আসায় বিয়েতে রাজি হয়ে গেল।বাবার নতুন বউয়ের যদি ছেলে না হয় তাহলে বাবা কি আবারো আর একটা বিয়ে করবে..?

দেখোতো আমি একাই বগ বগ করে যাচ্ছি আমার পরিচয়টা দিতে ভুলে গিয়েছি। আমি শারমিন নিশি ক্লাস এইটে পড়ি চার বোনের মধ্যে সবার ছোট ।

আমার বড় বোনের নাম জান্নাত চার বছর হল বিয়ে হয়েছে একটা ছেলে আছে। মেঝ আপু আইন নিয়ে পড়াশুনা করছে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে। ছোট আপু ইন্টার দ্বিতীয় বর্ষে পড়ে। মজার বিষয় হল বাবা যে বিয়ে করছে আপুরা কেউ জানে না কারন আপুরা জানলে এই বিয়ে কখনো হতে দিতো না। কি আজব ব্যাপার যেখানে বাবা মেয়ে বিয়ে দেবার কথা সেখানে বাবা নিজেই বিয়ে করতে যাচ্ছে।

বাবার খুব ইচ্ছা আমি যেন তার বিয়ের বর যাত্রিতে যাই কিন্তু আমি মাকে একা রেখে কোথাও যাবো না।

বিয়ে করে বাবা নতুন মাকে নিয়ে এসেছে। সবার সাথে নতুন মাকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে।

— নিশি এদিকে আসো এটা হল তোমার নতুন মা।এখন থেকে উনাকে ছোট মা বলে ডাকবে।

— আমি মাথা নাড়িয়ে উত্তর দিলাম ঠিক আছে বাবা।

মা আমাকে জড়িয়ে ধরে চোখ বন্ধ করে আছে।

মা তোমার কি অনেক কষ্ট হচ্ছে। আমি মাথায় তেল দিয়ে দেই।

— না মা, তুমি ঘুমাও সকালে স্কুলে যেতে হবে।

— বাবা বলেছে কাল স্কুলে যাওয়া লাগবে না।

— পৃথিবী উল্টে গেলেও পড়াশুনা বন্ধ দেওয়া যাবেনা কাল তুমি স্কুলে যাবে। তোমাদের কে অনেক বড় হতে হবে। সবাই গর্ব করে বলবে খন্দকার বাড়ির মেয়ে।

সারারাত মা একটুও ঘুমাইনি ডুকরে ডুকরে কেঁদেছে। আমি একাই ছিলাম মায়ের কষ্টের সাক্ষী।

পর্বঃ০২

সকালে রেডি হয়ে স্কুলে চলে আসলাম। স্কুলের সবাই আমার দিকে তাকিয়ে ব্যঙ্গ করে হাসছে। আমি মাথা নিচু করে ক্লাসে ঢুকে পরলাম। নিলা আমার ক্লাসমেট ওর সাথে কখন আমার ভালো সম্পর্ক ছিল না। নিলার কাজ হলো আমার পিছনে লেগে থাকা।

— কিরে নিশি শুনলাম তোর বাবা নাকি বিয়ে করেছে। আচ্ছা তোর যদি ভাই হয় তাহলে তোর আব্বারে কি বলে ডাকবে নানা। নিলার কথা শুনে ক্লাসের সবাই হাসিতে ফেটে পরেছে।

স্যার এসে ওদের কথা শুনে ফেলে সাবাইকে খুব বকা দেয় আর নিলাকে ক্লাস থেকে বের করে দেয়েছে।

স্যার আমার হাতটা ধরে বাহিরে নিয়ে এসেছে। স্কুলের জারুলতলায় বসে স্যার শুধু একটাই কথা বলেছে।

— নিশি জীবনটা বড় কঠিনরে মা। চলার পথে শত বাঁধা আসবে সবাই তোমার শুভাকাঙ্ক্ষী হবে না । এর মধ্যে তোমাকে মানুষের মত মানুষ হতে হবে। জীবনটাকে সুন্দর ভাবে সাজাতে হবে। কে কি বলে তা মাথায় নেবে না তোমার শুধু একটা জীনিস মাথায় রাখবে পড়ালেখা করে দেখিয়ে দেবে মেয়েরাও বাবার সম্মান ধরে রাখতে পারে চলার পথে বাবা -মায়ের লাঠি হতে পারে। আমি জানি তুই পারবি তোকে পারতেই হবে।

আমি মুগ্ধ হয়ে স্যারের কথাগুলো শুনেছি আর মনে মনে প্রতিঙ্গা করেছি মায়ের মনের আসা পুরন করবো। আমি ডাক্তার হব।

স্কুল থেকে এসে মাকে ঘরে কোথাও খুঁজে পাচ্ছিনা। পুকুরপাড় গিয়ে দেখি মা কাঁদছে। আমি যেয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে আছি।
মাগো তুমি কেঁদোনা তুমি যা বলবে আমি তাই করবো। তোমার সব দুঃখ দূর করে দেবো।

বাড়ির সবাই খুব খুসি ছোট মার বাচ্চা হবে। বাবা ছোট মায়ের খুব যত্ন করে।

ছোট মাকে আমার খুব একটা পছন্দ না। সবার সামনে ভালো ব্যবহার করলেও আমি একা থাকলে বাজে ব্যবহার করে।

ঐ দিন বাবার সাথে বাজারে যেতে চেয়েছিলাম ছোট মা বাবা সামনে নোংরা ভাষার রাগারাগি করলো বলে এতবড় দামড়ি মাইয়া বাজারে যাবি কি করতে বেডাগো শরীলে গা ঘসতে।আমি লজ্জায় কেঁদে দিয়েছি বাবা ঐ মহিলাকে কিছুই বলেনি শুধু এই চুপ করো।

আমি জীবনেও বাবার সাথে কোথাও যাবার কথা মুখেও আনবোনা।

এদিকে বড় আপুর শ্বশুর বাড়ির লোকেরা
বাবার উপর রেগে আছে। আপুকে এখানে আসতে মানা করে দিয়েছে।

একটা বছর হয়ে গেছে আপুরা বাড়িতে আসে না।

বাবা আগের মতো আপুদের সাথে যোগাযোগ করে না। আগে প্রতি মাসে এক বার করে ছোট আপুকে দেখে আসতো এখন আপুদের সাথে ফোনে কথা বলার ও সময় নাই।

বাসায় লোক জনে ভরা আত্নীয়স্বজনরা সবাই এসেছে। ছোট মায়ের ছেলে হয়েছে। বাবা আজ অনেক খুশি। একটা গরু, দুইটা ছাগল জবাই দেয়া হয়েছে সমস্ত গ্রামের লোকেদের খাওয়ানো হবে।
আকিকা দিয়ে ভাইয়ের নাম রাখা হয়েছে খন্দকার ফজলে আরমান।

ভাইটাকে আমাদের কে ধরতে দেয় না। আমারা নাকি ভাইয়ের বড় শত্রু সুজোগ বুঝে মেরে ফেলবো।

বাবা এসে মায়ের আঁচলের থেকে চাবির গোছাটা খুলে নিয়ে গেছে। ছোট মা বাবার কাছে আবদার করেছে সংসারের সব দায়িত্ব সে চায়।বাবাও উপহার হিসাবে সংসারের কতৃত্ব ছোট মাকে দিয়েছে কারন সে ছেলের মা।

আমার মা এখন আর এই পরিবারের কেউ না মায়ের প্রয়োজন নাই। আমি জানি বাবার উপর মায়ের অনেক অভিমান তাই পুতুলের মত সব কিছু দেখেও দেখে না।

ছোট মায়ের বড় ভাই এসেছে এখন থেকে আমাদের সাথে থাকবে। বাবার সাথে ব্যবসায় দেখাশুনো করবে। বাবা একা ব্যবসায়ের সব দিক একা সামলাতে পারছে না তাই ছোট মা উনার ভাইকে খবর দিয়ে এনেছে।

লোকটা কেমন করে যেন মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে।
আমার ওই মামাটাকে সুবিধার মনে হয় না। কারনে অকারনে আমাদের রুমের সামনে দিয়ে ঘোরাফেরা করে।

বাবাটা না কেমন যেন হয়ে গেছে আমাকে এখন আর একদম ভালোবাসে না।
তিন দিন ধরে বাবাকে বলেছি একটা নোট বই আর কাগজ লাগবে। বাবার মনে থাকে না অথচ ভাইয়ের জন্য ব্যাগ ভরে বাজার করে নিয়ে আসে।

বাবা বাহিরের থেকে এসেই ছোট মায়ের রুমে চলে যায় আমাদের সাথে কথা বলতেও মনে হয় বাবার কষ্ট হয়।

বাবা তোমার মনে আছে আমি মিষ্টি পছন্দ করতাম বলে তুমি আমাকে আদর করে মিষ্টি নামে ডাকতে। মা রাগ হবে দেখে তুমি প্রতিদিন লুকিয়ে আমার জন্য মিষ্টি কিনে আনতে। সপ্তাহে একবার করে গঞ্জে নিয়ে যেতে নতুন কাপড়, চুড়ি, কতকি কিনে দিতে।

বাবাগো এই কদিনে কিভাবে সব কিছু ভুলে গেলে। কতদিন আমাকে মিষ্টি বলে ডাকোনা।

ছোট মা স্যারকে বাসায় পড়াতে আসতে মানা করে দিয়েছি এগুলো বার্তি খরচ।আমাকে একটা কোচিং খরচ দেবে।

শুধু আমার না আপুদের পড়ার খরচ দিতে বাবাকে মানা করে দিয়েছে। ছোট মা বলে মাইয়া মাইসের এত পড়া লেখা করে কি হবে। আপুরা নাকি পড়ালেখার নাম করে শহরে পোলাগো লগে ফোস্টিনোস্টি করে বেড়ায়।

আমাদের লেখাপড়া বন্ধ করার তোমরা কে।তোমারা হয়তো ভুলে গেছো সম্পত্তি বাবার একার না আমার মায়ের অর্ধেক সম্পত্তি। আমাদের পড়ার খরচ কখনো বাবা দেয়নি সারাজীবন মা দিয়েছে।

আমি প্রতিবাদ করেছি বলে বাবা ছোট মায়ের সামনে বসে আমাকে মেরেছে।

বাবা তুমি আমাকে কিভাবে মারতে পারলে…?

গল্পঃবাবার বিয়ে

পর্বঃ০৩

ক’দিন থেকে মায়ের শরীরটা ভালো না কিছু খাতে পারেনা বমি করে, মাঝে মঝে বুকে ব্যথা উঠে। বিকালে ডাক্তার চাচা মাকে দেখতে আসবে।

ওদিকে বড় আপু আমাদের চিন্তায় কাঁদতে কাঁদতে অসুস্থ হয়ে গেছে।

মায়ের হৃদরোগের সমস্যা হইছে। ডাক্তার চাচা মাকে শহরে নিয়ে ভালো ডাক্তার দেখাতে বলেছে।

বাবা ব্যবসায় কাজ নিয়ে অনেক ব্যস্ত মাকে নয়ে ডাক্তার দেখানোর সময় নাই অথচ আগে মায়ের সামান্য জ্বর হলেও চিৎকার চেঁচামেচি করে বাড়ি মাথার তুলতো মাকে জোড় করে ডাক্তার কাছে নিয়ে যেতে।

বাবা মায়ের প্রতি তোমার শেই ভালোবাস গেলো কোথায়..?

স্ত্রী প্রতি, সন্তানের প্রতি তোমার ভালোবাস এত তাড়াতাড়ি ভাগ গেলো।

ছোট আপু আর বড় মামাকে খবর দেওয়া হয়েছে আগামিকাল এসে মাকে ঢাকা নিয়ে যাবে।

আমারা চার বোন ভালো রেজাল্ট করলে বাবা খুসিতে এলাকা সবাইকে মিষ্টি খাওয়াতো । ছোট আপু কুয়েটে চান্স পেয়েছে বাবা হয়তো ভুলে গেছে সেই খুশিরর দিনগুলোর কথা।

আমার বার্ষিক পরীক্ষা চলছে আর দুইটা পরীক্ষা বাকি আছে তাই মায়ের সাথে ঢাকা যেতে পারবোনা।

মা বাসায় নেই এই সুজগে ছোট মা আমাকে দিয়ে বাড়ির সব কাজ করিয়েছে। বাড়িতে তিন জন কাজের লোক থাকা সত্বেও মশলা বাটা, কাপোড় ধোয়া, থালাবাটি ধোয়া, সমস্ত বাড়ির উঠান ঝাড়ু দেওয়াইছে।

বাবা তুমি তো একবার ও খোঁজ নিলেনা আমি কেমন আছি?? তুমি কি কিছু দেখোন আগেতো এক গ্লাস পানিও নিজের খেতে দিতে না।

শুনেছি মা মরলে বাপ হয় তালোই আর আমার মা থাকতে বাপ হইছে তালোই।

হাতের ঠোসকা পোরে গেছে ব্যথ্যায় জ্বর উঠছে। সারাদিন তেমন কিছু খাইনি শুধু দুপুরে কলা আর এক পিচ রুটি খেয়েছিলাম। অনেক রাত খুব খিদা পায়েছে খেতে গিয়ে দেখি আমার জন্য গুরা মাছের চরচোরি আর ডাল রাখা যা আমি খাই না রুমে এসে শুয়ে পড়লাম কিন্তু খিদায় ঘুম আসছে না।

আজ বুঝালাম খুদার জ্বালা কি কোন দিন না খেয়ে থাকিনি মা জোড় করে খায়িয়ে দিত। আগে রাতে মাঝে মাঝে ঘুমিয়ে পরতাম বাবা প্লেটে করে খাবার এনে ঘুম থাকে উঠিয়ে খায়িয়ে দিত। ঐ সব দিন গুলো এখন শুধু দীর্ঘশ্বাস আর স্মৃতি।

বার বার শুধু সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতাটা মনে পরছে।

হে মহাজীবন, আর এ কাব্য নয়।

এবার কঠিন, কঠোর গদ্যে আনো।

পদ- ললত্য ঝাঙ্কার মুছে যাক।

প্রয়োজন নেই কবিতার স্নিগ্ধত।

কবিতা তোমায় দিলাম ছুটি

ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময় পূর্নিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।

জমিলা খালা বুঝতে পেরেছিল আমার খুব খুধা লাকছে। উনি এসে আমাকে জিঙ্গেস করলো কি গো মা খিদা লাকছে।

–আমি মাথা নাড়ালাম।

— বেডি একটা হারামি এত কোইরা কইলাম ছোট মনি গুরামাছ খায় না ওর জন্য ইলিশ মাছের বড় দুইডা টুকরা রাইখা দাও অসুস্থ সারাদিন ভাত খায়নায়। হারামি বেডি শুনলো না ইচ্ছা কইরা তোমার ঐ কুটনি ফুফুগো সব মাছ দিয়া ভাত খাওয়াইয়া দিল। আম্মাগো তুমি একটু অপেক্ষা কর আমি তোমার লইগা ভাত নিয়া আইতাছি।

জমিলা খালা ডিম ভাজি, বেগুন ভাজি করে আনছে নিজে হাতে আমাকে খায়িয়ে দিল। উনিতো আমার রক্তের কেউ না চারটা ছয়টা বছর আমাদের বাড়ি কাজ করে তার ও আমার প্রতি এত ভালোবাসা।

আমার হাতে রক্তপড়া দেখে কাঁদে দিছে দুই হাত ধরে অসখ্য চুমু খাইছে। শুধু একটা কথা বলতে ছিল আম্মাগো তোমারে দিয়া কাজ করতে মানা করছিলাম। মাগীর জি মাগী আমাগো সবাইরে ভয় দেহাইছে আমারা তোমার কাজ কইরা দিলে বাড়ি থেকে তাড়াইয়া দেবে। খিদার জ্বালা বড় জ্বালা অভাবের কাছে আমাগো হাত পা বাঁধা এই বুড়া বয়সে কোই জামু।

বাবা তোমার সাথে আমার রক্তের সম্পর্ক আমার জন্মদাতা পিতা।
তোমার কি আমার জন্য একটুও মায়া লাগেনা…?

ভাইটা আমারে দেখলে খিল খিল করে হেসেদেয় দু’হাত বারিয়ে কোলে নিতে বলে।
সকালে আমাকে দেখে চাচির কোল থাকবে না । আমার কোলে আসছে কি যে খুশি ছোট মা দেখেই আমার কোল থেকে জোড় করে ভাইটাকে টেনে নিয়ে গেলো। মা আলাদা তাতে কি বাবা তো একি ও আমার রক্তের ভাই। আমাদের কি কোন অধিকার নেই ভাইটাকে কোলে নেবার।

ছোট মা ভোররাতে এসে আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলেছে কাজ করানোর জন্য। প্রতিবছর শিতের দিন খেজুরের রস দিয়ে গুড় বানায়। আজ গুর বানাবে বড় পাতিলে করে রস জালাচ্ছে। আমি দাঁড়িয়ে আছি ছোট মা এক জগ গরম রস এনে ইচ্ছা করে আমার পায়ের উপর ফেলে দিয়েছে।

আমি শুধু মাগো করে একটা চিৎকার দিছি তারপর আর কিছু মনে নেই।
আমার ডান পায়ের হাটু থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত চামড়া উঠে মাংস বেরিয়ে গেছে ব্যথায় কাতরাচ্ছি। কবিরাজ চাচা এসে কিসব ছাল বাকল দিয়ে পা বেঁধে দিয়ে গেছে।

মাগো তুমি তাড়াতাড়ি চলে আসো দেখো তোমার ছোট মনিটার কি হাল করেছে। ওরা মেরে ফেলবে আমাকে।

মুক্তা আপা ছোট বেলা থেকে আমাদের বাসায় আছে ওনাকে কখন বাসার কাজের লোক হিসাবে দেখিনি। খুব ভালোবাসে আমাকে গত দুদিন ধরে এক গ্লাস পানি ও মুখে দেইনি আমি অসুস্থ তাই। আপুর একটা রেডিও আছে প্রতিদিন নয়টার সময়ে ঢাকা বেতারে ছায়াছবির গান হয় আমি বাসায় থাকলে মুক্তা আপুর সাথে বসে গান শুনু। শুয়ে থেকে ভালো লাকছে না আপুকে রেডিও ছাড়তে বলছি। আমি গান শুনতেছি আপু আমার পা পরিস্কার করে দিচ্ছে। রেডিও তে একটা গান হচ্ছে…

মন্দ হোকা আর ভালো হোক বাবা আমার বাবা পৃথিবীতে বাবা মত আর আছে কেবা।

স্বর্গের মত ছিল আমাদের ঘর যেখানে ছিল শুধু সোহাগ আর আদর।

সেই ঘর থেকে বাবা হারিয়ে গেলো আমার কপালে তাই দুঃখ এলো।

আজ বুঝেছি আমি বাবা কি ছিলো….

আমার খুব কষ্ট হচ্ছে বুক ফেটে কান্না আসছে চিৎকার করে কেঁদে আমার ও বলতে ইচ্ছা করছে..

ভালো হোক আর মন্দ হোক বাবা আমার বাবা পৃথিবীতে বাবার মত আর আছে কেবা।

গল্পঃবাবার বিয়ে

পর্বঃ০৪

মাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে তিন দিন ধরে সদর হাসপাতালে ভর্তি আছি।পায়ে পোড়া স্থানে ওসব ছাল বাকোল দেবার কারনে ইনফেক্সন হয়েছে। মাকে জানানো হয়নি আমি অসুস্থ। আমার পা পুড়ে গেছে খবর পেয়ে ছোট মামা এসে হাসপাতালে নিয়ে আসছে সাথে মুক্তা আপু আছে। মেঝো আপু নাইটের গাড়িতে চরেছে সকালের মধ্যে এখানে পৌছিয়ে যাবে।

বাবা শুধু মামাকে দশ হাজার টাকা দিয়ে কর্তব্য পালোন করতে চেয়েছিলো। মামা বাবার কাছ থেকে এক টাকাও নেয়নি। বাবা একটা বারের জন্য আমাকে দেখতেও আসেনি অথচ রায়হান স্যার এসে আমাকে দেখে গেছে।

খুব কষ্ট পেয়েছিলাম যখন বাবাকে বলেছি ছোট মা ইচ্ছা করে আমার পা পুড়িয়ে দিয়েছে বাবা আমার কথা বিশ্বাস করেনি ছোট মা যা বলেছে তাই বিশ্বাস করেছে। সংসারে অশান্তি লাগানোর জন্য নাকি এই কাজ করেছি বাবার সুখ দেখে আমাদের সহ্য হচ্ছে না।

একদিনে ডাক্তার, নার্সদের সাথে ভালো সম্পর্ক হয়ে গেছে সবাই আমাকে অনেক ভালোবাসে বিশেষ করে সাহেদ ভাই।

বড় আপু অনেক প্রকার খাবার রান্না করে পাঠিয়ে দিয়েছে জ্বর, শরীরে ব্যথার কারনে কিছুই খেতে পারিনা।

মেঝো আপুটার কষ্ট হচ্ছে আমার জন্য একটুও ঘুমাতে পারেনা দিন-রাত জেগে থাকে সেবা যত্ন করে ।

সাহেদ ভাইয়ের আপুকে অনেক পছন্দ হয়েছে মামার কাছে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে। আপুর ও মনে হয় সাহেদ ভাইকে পছন্দ হয়েছে দেখলে মুচকি মুচকি হাসে।

আগামিকাল সকালে বাড়িতে যাবো। মা ঢাকাতে আছে এখনো বাড়ি আসেনি।

আপুর সাথে সাহেদ ভাইয়ের বিয়েটা ঠিক হয়ে গেছে। ছোট মা, চাচা ফুফুদের দেখেই বোঝা যাচ্ছে ওনারা কেউ খুসি হয়নি। উল্টা গ্রামে সবার কাছে বলে বেড়াচ্ছে কি মাইয়া দেখছো শহরে ডাক্তার দেখাইতে যাইয়া বেডা ধইরা আনছে। মিয়া ভাইরে বিয়া করাইয়া ভালো করছি। এই মাইয়ারা ভায়ের মানসম্মান কিছুই রাখবে না।

পায়ের ঘা কোমছে কিন্তু ঠিক মত হাটতে পারিনা। মা আমার এই অবস্থা দেখে চিৎকার করে কাঁদছে এর আগে মাকে এভাবে কাঁদতে দেখিনি। মা আমাকে চোখের আড়াল হতে দেয়না আমার রেজাল্ট দিয়েছে স্কুলে যেতে দেয়নি। মেঝো আপু আর মুক্তা গেছে রেজাল্ট আনতে। রেজাল্ট দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেছে তৃতীয় হয়েছি। আমি ক্লাসে কখন দ্বিতীয় হয়নি। আপু সাথে বাবার কথা কাটাকাটি হয়েছে কেন আমার প্রাইভেট টিচার রাখা বন্ধ করে দিয়েছিল। বাবা সাফ জানিয়ে দিয়েছে সে আমাদের পড়ালেখার পিছনে এক টাকাও খরচ করবে না ।

জেবা আপু (মেঝ আপা) বিয়ে উপলক্ষে আপুরা সবাই বাড়িতে এসেছে।

বড় দুলাভাই স্কুলে গিয়ে রায়হান স্যারকে ঠিক করে এসেছে আমাকে বাসায় এসে পড়ানোর জন্য।

আপুর বিয়েতে বাবা কোন খরচ দিতে পারবে না বাবার হাতে টাকা পয়সা নাই। অথচ দু’দিন আগে ভাইয়ের জন্মদিন উপলক্ষে ভাইয়ের নামে তিন বিঘা জমি কিনে দিয়েছে। মামারাই আপুর বিয়ের সব ব্যবস্থা করেছে।

গতরাতে বাড়িতে ডাকাতি হয়েছে নগদ তিন লাক্ষ টাকা আর আপুর বিয়ের গহনা ডাকাতেরা নিয়ে গেছে।

এত পাহারাদার থাকার পরেও ডাকাতরা কিভাবে ঘরে ঢুকলো আর দরজা খুললো কিভাবে..?

ঘরে ডাকাতি হবার সময় ছোট মার ভাই ঘরে ছিলোনা ওই সময় উনি কোথায় ছিলো। ডাকাতরা শুধু আপুর বিয়ের গহনা নিয়ে গেলো বাসায় তো ছোট মার স্বর্নের জিনিসপত্র ছিল তা নিলো না কেনো।

বাবার বিশ্বাস মা নাকি মামাদের দিয়ে লোক ভাড়া করে বাড়িতে ডাকাতি করিয়েছে। ৩৭ বছর সংসার করার বিনিময়ে মা পেলো মিথ্যা অপবাদ।

ফুপাতো ভাইয়েরা গিয়ে আপুর বিয়েটা ভেঙে দিয়ে এসেছে। এখন সাহেদ ভাইয়ের বাসার লোকেরা এ বিয়েতে রাজি না।

সাহেদ ভাই একাই এসেছে আপুকে বিয়ে করার জন্য। সাহেদ ভাই মায়ের কাছে হাত জোর করে আপুকে চাচ্ছে।

সাহেদ ভাই– আমি জানি আপনারা খুব আশ্চর্য হচ্ছেন এত কিছুর পরেও কেন আমি বিয়েটা করতে চাচ্ছি। আমার ছয় বছর বয়সে মা মার যায়। বাবা আবার বিয়ে করে ঘরে আসে সৎ মা। সৎ মা কখনো আমাকে নিজের সন্তান হিসাবে মেনে নিতে পারিনি ঠিক মত খেতে দিতোনা, আমাকে দিয়ে বাড়ির কাজ করাতো। মাছ, মাংস রান্না করলে আমাকে খেতে দিতোনা। আমাকে দিত সাদা ভাত আর শুকনা মরিচ। জানেন একটু ভালো খাবার খাওয়ার জন্য নদীতে, পুকুর থেকে মাছ ধরে আনতাম। মাকে বলতাম মা আজকে আমাকে একটা বড় মাছ দিয়েন কিন্তু মা কোন সময় আমাকে একটা বড় মাছের টুকরা দিতো না বেছে বেছে সব থেকে ছোট মাছটা আমার প্লেটে দিও।

প্রতিবাদ করলে কপালে মাইর ছাড়া কিছু জোটতো না। কত দিন কত রাত না খেয়ে কাটিয়েছি তার ঠিক নাই। আব্বা দেখেও না দেখার ভান করে থাকতো।

আমি অনেক কষ্টে পড়ালেখা করেছি মানুষের বাড়ি কামলাগিরি ও করেছি।

এস এস সি পাশ করারা পরে নানা এসে আমাকে নিয়ে যায়। মামারা,খালারা মিলে আমার সব খরচ দেওয়া শুরু করে। আমি মেডিকেলে চান্স পাবার পরে সবার কাছ থেকে টাকা নেওয়া বন্ধ করে দেই টিউশনি করে নিজের খরচ নিজেই চালাতে শুরু করি। আমি জানি সৎ মায়ের জ্বালা কি..?

মেডিকেলে নিশিকে দেখে আমার খুব কষ্ট হয়েছিল। সৎ মায়েরা যে কি অত্যাচারী হয় যারা এর স্বিকার হয় তারাই একমাত্র জানে।

জানেন মা আমি যখন থেকে বুঝতে শিখেছি মনে মনে পণ করেছি কখনো দুটা সন্তান নেবো না কারন প্রথম সন্তানের ভালোবাসার ভাগ হয়ে যাবে। একটা বাচ্চা থাকলে পুরো ভালোবাসা, সম্পত্তি ও পাবে আর দুটা হলে অর্ধেক অর্ধেক। তাই আমি দুইটা সন্তান কখনো নেবো না।

মা জেবাকে আমি আপনাদের কাছে ভিক্ষা চাই আমি কথা দিচ্ছি ওরে কোন দিন কষ্ট দেবো না। আমি আপনার ছেলে হতে চাই।

কোন অনুষ্ঠান ছাড়া এক কাপড়ে আপু বিয়েটা হয়ে গেলো। মায়ের গহনার চার ভাগ করে এক ভাগ জোর করে আপুকে দিয়ে দিয়েছে। মামারা চেয়েছিল আপুকে আসবাবপত্র বানিয়ে দিতে সাহেদ ভাই এক টাকার জিনিসপত্র নেবে না। বিয়ে করে ঐদিন রাতেই আপুকে নিয়ে চলেগেছে।

ছোট মায়ের বাবার বাড়ির লোকেরা আলাদীনের চেরাগ পেয়েছে। আগে দুইবেলা ঠিক মত ভাত খেতে পারতোনা এখন বাড়িতে দালানঘর তুলছে, জমি রেখেছে, বাজারে ফলের দোকান ও দিয়েছে। বাবার এখন চোখ থেকেও অন্ধ ।

আমাদের রাইসমিলটা বিপুল পরিমান লস হয়েছে বন্ধ হবার মত অবস্থা।

এদিকে ছোট মায়ের আবার বাচ্চা হবে। বাবা ইদানীং আমাদের রুমের কাছে রাতে ঘোরাঘুরি করে মায়ের সাতে ঘনিষ্ট হতে চায়।

স্কুলে টেষ্ট পরীক্ষা চলছে পরীক্ষা শেষে বাসায় এসে দেখি মা বিছানার পড়ে আছে সমস্ত শরীরে রক্তের ছোপ ছোপ দাগ।

গল্পঃবাবার বিয়ে

পর্বঃ০৫

বাসায় এসে দেখি মা বিছানায় পরে আছে সমস্থ শরীরে রক্তে ভরা। মায়ের গায়ের থেকে কাপড়টা সরিয়ে দেখি বিভিন্ন জায়গায় কাঁটা তা দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে মায়ের কোন হুস নাই। মুক্তা আপার কাছ থেকে জানতে পারি বাবা মাকে লাঠি দিয়ে অনেক মেরেছে কেন কিসের জন্য জানিনা।
আমি কি করবো কিছু বুঝতে পারছি না। ছোট চাচি এসে মায়ের কাঁটা স্থানে ব্যথার মলম লাগিয়ে দিয়েছে।

আমি মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছি আজকে মাকে মেরে ফেলতে পারতো।

মায়ের কাছে জিঙ্গেস করেছি কেনো বাবা মায়ের গায়ে হাত তুলেছে।

মায়ের কাছ থেকে জানতে পারি। সৎ মা আর তার ভাই মিলে ধানের গোলা থেকে তের বোস্তা ধান চুরি করে নিয়ে যাবার সময় মা দেখে ফেলে। ছোট মা নিজেদের দোষ ঢাকার বাবার কাছে গিয়ে মিথ্যা কথা বলে আমার মা তার ভাইয়ের সাথে ফিজিক্যাল রিলেশন করতে চেয়েছে। প্রায়ই মা তার ভাইয়ের রুমে যায়। আজও মা নাকি ছোট মায়ের ভাইয়ের হাত ধরে টানাটানি করেছে। বাবা ছোট মায়ের নোংরা কথাগুলো বিশ্বাস করে মায়ের গায়ে হাত তুলেছে। বাবা আমার মা প্রবীত্র তেকে অপ্রবীত্র বানাতে তোমার একটুও খারাপ লাগলো না।

আমি –মাগো আর কতো চুপ করে থাকবে কিছু তো বলো।

মা — অনেক হইছে আর না নিশি তুই এখন মুক্তাকে সাথে করে নানা বড়ি যা তোর মামাদের খবর দে। ছোট মামাকে বলবি বাজারে গিয়ে ফোন করে তোর আপুদের দুই দিনের মধ্যে বাড়িতে আসতে বলে। তোর বড় মামাকে আর মেঝো মামাকে সাথে করে নিয়ে আসবি যেকোন সময় ওরা কোন অঘটন ঘটাতে পারে।

আমি আর এক মিনিট ও দেরি করলাম না। জমিলা খালাকে মার কাছে রেখে নানা বাড়ি চলে আসলাম। আমাদের বাসা থেকে নানাদের বাসা তিন মাইল দূরে। মামদের কে সব কিছু খুলে বললাম। মামার আমার কথা শুনে সাথে সাথে আমাকে নিয়ে বড়িতে চলে এসেছে । বড় মামা অনেক রেগে আছে।

রুমের দরজা ভিতোর থেকে আটকানো মায়ের সামনে আমরা তিন জন বসে আছি।

মা — আমি যদি তোমাদের বাবার সাথে আর সংসার না করি। তোমাদের কোন অভিযোগ থাকবে আমার উপর । তোমারা কি রাজি আমার সিদ্ধান্তে।

আমরা চার বোন মাকে জড়িয়ে ধরেছি। মাগো তোমার প্রতি আমাদের কোন অভিযোগ না। এই সিদ্ধন্ত তোমার আরো আগে নেওয়া উচিত ছিল।

এই তিন বছর ধরে কমতো আর অপমান, অপবাদ সহ্য করলে না শেষ পর্যন্ত এই বুড়ো বয়সে মার ও খেলে আর কত সহ্য করবে তুমি।

আমার মায়ের আটত্রিশ বছরের সংসার জীবনের ইতি ঘটলো। মা বাবাকে ডিভোর্স দিয়ে দিয়েছে। মাঝো আপু সব ব্যবস্থা করেছে। আপু ছয় মাস হয়েছে জর্জ কোটের এডভোকেট হয়েছে।

আমাদের দেশে অনেকে বলে ইসলামে চারটা বিয়ে ফরজ এটা নাকি বাধ্যতামূলক। এই ফতোয়া দিয়ে অনেকে একাধিক বিয়ে করে। কিন্তু ইসলাম ধর্মে কি বলেঃ-
ইসলামের বিধানে একক বিবাহ এবং বহু বিবাহ দুইটারি সম্মতি রয়েছে। তবে একক বিবাহ বেশি প্রচলিত। বহু বিবাহ ইসলাম উৎসাহিত করেনি।

সুরা আল নিসার ৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে তোমাদের পছন্দ মত বিয়ে করো দুই, তিন, চার জনকে তবে যদি ন্যায় বিচার করতে না পারো তাহলে একজন কে বিয়ে করতে হবে। আবার
সুরা নিসার ১২৯ নম্বর আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে এটা অসম্ভব যে তুমি সব স্ত্রীকে সমান ভাবে দেখবে তবে তাদের উপর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না।

এখানে কোরাআন যা বোঝাতে চেয়েছে ন্যায় বিচার বলতে ভালোবাসার কথা বলেছে। কোন ব্যক্তি স্বীয় স্ত্রী গনের সাথে সমান ব্যবহার দ্বারা দাম্পত্য জীবনের সুখশান্তি বজায় রাখতে পারে ও অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা, সময় ইত্যাদি সমান ভাবে দিতে পারে তার জন্য একান্ত প্রয়োজনবোধে চারজন স্ত্রী গ্রহনের অনুমতি আছে কিন্তু কোন নির্দেশ নাই। একজন স্ত্রী কে একটা বাড়ি কিনে দিলে অন্য জনও যেন বাড়ি পায়।

তাই কোরআনে বলেছে তখনি একটার বেশি বিয়ে করো যদি তুমি ন্যায় বিচার করতে পারো। যদি না পারো একটার বেশি বিয়ে কোরোনা।

ইসলাম ধর্মে একটা বিয়ে ফরয চারটা বিয়ে না। বহুবিবাহ হল মূবা (ঐছিক)

বাবা মায়ের সাথে যা কিছু করেছে সব অন্যায়। এত বছর সংসার করেও মায়ের চরিত্র সম্পর্কে ধারোনা হয়নি।

হিন্দু এলাকাতে মায়ের নামে একটা বাড়ি আছে আমরা এখন থেকে এখানে থাকবো। মা -বাবার বাসা থেকে আসার সময় একটাই কাজ করেছে মায়ের পায়ের জুতা দিয়ে বাবার গালে একটা বারি দিয়েছিলো। আমি মনে করি আমার মা কোন ভুল কাজ করেনি।

মেঝো আপু – সাহেদ ভাইয়া আমাদের শহরে নিতে চেয়েছি মা যাবে না।

আপুর কাছে শুনলাম বাবা মায়ের নামের সম্পত্তি নিজের নামে রেকর্ড করিয়ে নিয়েছে। ওই দিন রাতে মামারা যদি আমাদের সাথে না থাকতো মা আর আমাকে মেরে ফেলে আত্নহত্যা বলে চালিয়ে দিতো। সৎ মা লোক ঠিক করেছিলো আমাদের দু’জনকে মারার জন্য বাবাও জানতো।

বাবা ছিঃ এত নিচ কিভাবে হলে???

দেখতে দেখতে আমার এস. আস. সি পরীক্ষা শুরু হয়ে গেছে। পরীক্ষাকেন্দ্রে আমার সাথে আপু আর মামা এসেছে।

অধিকাংশ ছেলে মেয়েদের সাথে তাদের বাবা এসেছে।
আগে যখন আপুদের পরীক্ষা হতো বাবা আপুদের সাথে আসতো। সবি এখন স্মৃতি।

পরীক্ষা দিয়ে আসার সময় বাজারে বসে বাবার সাথে দেখা হয়েছিল। বাবা বিশাল বড় রুই মাছ কিনেছে তার শ্বশুরবাড়ির লোকেরা বেড়াতে এসেছে । বাবা আমাদের কে দেখেও না দেখার ভান করে চলে গেছে। আপুও আমাকে নিয়ে বাসায় চলে এসেছে। একঘণ্টা পরে বড় মামাও চার কেজি ওজনের একটা রুই মাছ নিয়ে হাজির।

গত তিন দিন ধরে বড় ফুফুর ছোট মেয়েটাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
কেউ যানে না রুনা আপু কোথায়..?

থানায় জিডি করা হয়েছে। চারদিন পর রুনা আপুর ছিন্নবিচ্ছিন্ন লাশ পাওয়া গেছে বাবাদের বাড়ির পিছনের বাগেনের ডোবাতে।

গল্পঃবাবার বিয়ে

পর্বঃ০৬

চারদিন পরে রুনা আপুর ছিন্নবিচ্ছিন্ন লাশ পাওয়া গেছে বাবাদের বড়ির পিছনের ডোবাতে। পুলিশ খুনের কোন আলামত খুঁজে পাইনি। ফুপুরা দোষ চাপাচ্ছে আমাদের উপর। থানায় গিয়ে আমাদের নামে ধর্ষণ, খুনের ্ মামলা করতে চেয়েছিল কিন্তু থানার ওসি কেস নেইনি । বড় দুলাভাই ও থানায় যেয়ে ওদের নামে মানহানি মামলা করেছে। থানার ওসি জাহিদ হলো বড় দুলাভাইয়ের চাচাতো ভাই উনি ভাইয়াকে ফুফুদের নামে মানহানি মামলা দিতে বলেছিল।

রুনার লাশ সদর হাসপাতালের মর্গে নেওয়া হয়েছি। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট দেবে এক দিন পর।

রুনা চার মাসের প্রেগন্যান্ট ছিল। আমার যদি রুনাকে গুম করে খুন করি তাহলে রুনাকে প্রেগন্যান্ট বানিয়েছে কে, কার সাথে রুনার অবৈধ সম্পর্ক ছিলো..?

জাহিদ ভাই খন্দকার বাড়িতে গিয়েছে তদন্ত করার জন্য। বাড়ির সবাইকে জিজ্ঞাসবাদ করেছে ছোট মায়ের ভাইকে জাহিদ ভাইয়ের সন্দেহ হইছে তাছারা ডোবার পাশে একটা পুরুষ মানুষের জুতা পাইছে।

ছোট মায়ের ভাইকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নেওয়া হয়েছে কারন ডোবার পাশের পড়ে থাকা জুতাটা ওনার। পুলিশের মাইর খেয়ে সব ঘটনা গরগর করে বলে দিয়েছে।
রুনার সাথে দু’বছরের সম্পর্ক ছিলো। মিথ্যা বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে শারিরিক সম্পর্ক করে। রুনা প্রেগন্যান্ট হবার পরে বিয়ের জন্য চাপ দেয়। সৎ মায়ের ভাই রুনাকে মেরে ডোবার মথ্যে ফেলে দেয়।

যে যেমন কর্ম করবে তার শাস্তি পেতি হবে।
ফুফু তুমি যেমন আমার মায়ের সংসার নষ্ট করে দিলে। গ্রামের মানুষের কাছে অপমান অপদস্থ করেছিলে আল্লাহ তোমার পাপের বিচার করেছে তোমার কোল থেকে তোমার মেয়েকে কেরে নিয়েছে। মেয়েও হারিয়েছো আর তোমাদের দেখলে গ্রামের মানুষ থুথু ছিটাবে । অবিবাহিত মেয়ের বাচ্চা হবে গ্রাম অঞ্চলে খুবি ঘৃনিতো বিষয়।
তোমরা আমার মায়ের সুখ কেরে নিয়েছো আল্লাহ তোমাদের সুখ কেরে নিয়েছে।

কথায় আছে লোভে পাপা আর পাপে মৃত্যু।
রুনা আপুও টাকার লোভে পরে দুই বাচ্চার বাপ বুড়া বেটার সাথে প্রেম করে পাপ কাজে লিপ্ত হয়েছিল। পরিশেষে পাপ কাজের ফল মৃত্যু হইছে।

এদিকে বাবার সাথে তার বোনের দাকুমড়ার সম্পর্ক হয়েছে। বাবা উকিল ধরেছে ছোট বউয়ের ভাইয়ের হয়ে কেস লরতেছে।
ভাই বোন কেউ কারো মুখ দেখেনা। চাচা, ফুফুরা সবাই বাবার উপর নারাজ।

আপুরা সবাই গ্রামে এসেছে আমার এস. এস. সি পরীক্ষার রেজাল্ট দেবে. মনের মধ্যে খুব ভয় এবার ই প্রথম জিপিএ পদ্ধতি শুরু হয়েছে । বড় মামা আর ছোট আপু রেজাল্ট আনতে গিয়েছে।

ছোট বেলায় যখন অনেক ভয় পেতাম বড় আপু হাত ধরে থাকতাম। আজকেও বড় আপুর হাত ধরে বসে আছি।
বড় দুলাভাইয়ের ট্রান্সফার হয়েছে খুলনাতে সামনের মাসে আপুরা খুলনা চলে যাবে। ছোট আপুর খুলনাতে একা থাকে বলে জন্য খুব টেনশন করতো এখন মায়ের আর ছোট আপুর জন্য চিন্তা করা লাগবেনা।

দূর থেকে বড় মামা আর নাজিয়া আপুকে দেখা যাচ্ছে। মামার হাতে অনেক মিষ্টির প্যাকেট। মুক্তা আপা দৌড়ে চলে গেছে ওদের কাছে। মামা মুখে জয়ের হাসি দেখেই বোঝা যাচ্ছে রেজাল্ট ভালো হইছে।

৪.৮৮ পায়েছি মা, আপুরা সবাই অনেক খুসি। মা আমার গালে চুমুতে ভরিয়ে দিয়েছে। ছোট মামা খুসিতে সমস্ত গ্রামে মিষ্টি ছিটিয়ছে।

আজকে বাসায় আমার পছন্দের সব খাবার রান্না করা হয়েছে। হাসের মাংস, রুটি পিঠা দেখেই জিভে পানি চলে এসেছে। আমি টুল নিয়ে চুলার পাশে বসে আছি মা প্লেটে করে রুটি, মাংস নিয়ে আমাকে খায়িয়ে দিচ্ছে।
মায়ের হাতে খাবার খেলে মনে হয় বেহেস্তের খাবার খাচ্ছি।

মুক্তার আপার বিয়ের কথা চলছে মেঝো মামার ইটের ভাটার ম্যানেজার সিদ্দিকের সাথে।

বাড়িতে উৎব মুখোর পরিবেশে বড় আপু, মেঝো আপুর দুজনের বাচ্চা হবে আর মুক্তার আপার বিয়ে।

এই কয় মাসে বাবা আমাদের কোন খোঁজ খবর নেয়নি।

আপুরা চাচ্ছে আমাকে শহরে ভালো কলেজে ভর্তি করাতে। আমি গ্রামের কলেজে পড়বো মাকে ছেড়ে কোথাও যাবো না আমি।
গ্রামের স্কুলে পড়ে যদি ভালো রেজাল্ট করতে পারি তাহলে কলেজে পড়ে পাড়বো না কেনো..??

উপজেলা পরিষদে কৃতি ছাত্র – ছাত্রীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে অভিভাবক হিসাবে আমার মাকে নিয়ে গিয়েছি। উপজেলার মধ্যে সব থেকে ভালো রেজাল্ট আমার এই জন্য আমার মা রাবেয়ে বেগম আকন্দকে সেরা মায়ের এওয়ার্ড দিয়েছে। অনেক দিন পর মাকে প্রান খুলে হাসতে দেখেছি। আমি শুধু আমার মায়ের গর্বিত সন্তান।

কলেজে বার্ষিক সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতারর আয়োজন করা হয়েছে।আমি কবিতা আবৃতি তে নাম দিয়েছি। স্কুলেও আমি প্রথম হোতাম।

কাজী নজরুল ইসলাম লেখা উপন্যাস, গল্প, কবিতা আমার প্রিয়। এই মানুষটা পথ দেখিয়ে গেছে যুদ্ধে ময়দানে না গিয়েও কলম দিয়ে যুদ্ধ করা যায়। প্রতিবাদের ঝড় তোলা যায়।

হেরা হতে হেলে দুলে নূরানি তনু ও কে আসে হায়।
সারা দুনিয়া হেরাযের পর্দা খুলে খুলে যায়।
সে যে আমার কামলীওয়ালা কামলীওয়ালা।
কি সৃস্টি, কি সুন্দর লেখনী যত শুনি যত পড়ি মুগ্ধ হয়ে যাই।

প্রতিযোগিতার মঞ্চে দাঁড়িয়ে আবৃতি করা শুরু করলাম

বল বীর
বল উন্নীত মম শির।
শির নেহারি আমারি নত শির।
এই শিখর হিমাদ্বির।

বল বীর
বল মহাবিশ্বের মহাকাশ ফারি
চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ তাঁরা ছাড়ি।
ভলোক, দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া যোগর আসন আরশ ছেদিয়া।
উঠিয়াছি চির বিস্ময় আমি বিশ্ব বিধাত্রীর
মম ললাটে রুদ্র ভগবান জ্বলে রাজ রাজটীকা দিপ্ত জয়শ্রীর।

বল বীর
আমি চির দুদ্মম, দুর্বিনীত, নৃশংস মহা প্রলয়ের আমি নটরাজ
আমি সাইক্লোন, আমি ধ্বংস, আমি মহাভারত।
আমি অভিশাপ পৃথ্বীর, আমি দূর্বোর, আমি ভেঙে করি সব চুরমার।
আমি অনিয়ম উচ্ছৃঙ্খল,
আমি দলে যাই যত বন্ধন
যত নিয়ম কানুন শৃখল
আমি মানিনা কোন আইন
আমি ভরা তরীকরি ভরা ডুবি।
আমি টর্পেডো, আমি ভীম ভাসমান মাইন
আমি এএলোকেশ ঝড় অকাল বৈশাখীর আমি বিদ্রোহী,
আমি বিদ্রোহী ……. ……..

আমিই উইনার হয়েছি।
মা দেখলে অনেক খুশি হবে।

মায়ের শরীরটা ভালোনা বুকে ব্যথাটা বেড়েছে।
অনুষ্ঠানে আসার আগে মাকে একটু অসুস্থ দেখে এসেছি।

বাড়ির সামনে এসে কলিজার ভিতরে একটা ধাক্কা খেলাম। এত মানুষ কেনো আমার পা চলছে না
শরীরে কোন শক্তি নাই।
ভিতরে এসে দেখি আমার মায়ের নিঃশ্বপ্রান দেহটা পড়ে আছে মেঝো আপু জড়িয়ে ধরে কাঁদছে।

ওমা উঠনা চোখ বন্ধ করে আছো কেন।
ওমাগো চোখ খোল একটা বার তাকাও।

মাগো তুমি রাগ হইছো আমি তোমাকে একা রেখে কোথাও যাবোনা মা উঠো।

আমি বাঁঁচবো কিভাবে, আমি কার কাছে থাকবো।
তুমি আমাকে একা রেখে চলে যেওনা মা।

বাবার বিয়ে সব পর্ব এক সাথে(বাংলা গল্প)নুসরাত মাহিন
বাবার বিয়ে সব পর্ব এক সাথে(বাংলা গল্প)নুসরাত মাহিন

গল্পঃবাবার বিয়ে

পর্বঃ০৭

আমি বাঁঁচবো কিভাবে, আমি কার কাছে থাকবো। তুমি আমাকে একা রেখে চলে যেওনা মা।

মাকে শেষ গোছল করিয়ে সাদা কাফনের কাপড় পরিয়ে রাখা হয়েছে, নাকের ভিতরে সাদা তুলো দেওয়া। মাথার ধারে আগোর বাতি জ্বলছে মায়ের গায়ে থেকে আতর আর কপূর এর ঘ্রান।

মুখটা কেমন ফ্যাকাসে হয়ে আছে। কোন চিন্তা নাই ভাবনা নাই নিঃচিন্তে ঘুমিয়ে আছে।

খন্দকার বাড়ির সবাই মায়ের লাশ দেখতে এসেছে।

মামাদের কে বলে দিয়েছি ওরা যেন বাড়ির তৃসীমানায় না ঢুকতে পারে । আমার বাবা নামের খুনিটাও মাকে দেখতে এসেছে। মৃত্যুর আগে জ্বলিয়ে শান্তি হয়নি তোদের মরার পরে কি দেখতে এসেছে..?
তোদের ঐ নগন্য চেহারা দেখলে আমার মা কষ্ট পাবে।

আপুদের কে হাত জোর করে বাবা মায়ের লাশ দেখার অনুমতি পেয়েছে। কিন্তু আপুরা হয়তো ভুলে গেছে বাবার সাথে মায়ের যেদিন ডিভোর্স হয়েছিল মা বলেছিল আমি মরে গেলে ও বাড়ির লোকেদের আমার চেহারা দেখা দূরে থাক আমার জানাজার সরিক যেন না হয়। আমি মায়ের কথা রাখবো। চাচা, ফুফু, যত আত্নিয় কাউকে পারমিশন দেইনি ভিতরে ঢোকার।

— কি দেখতে এসেছেন..? আমার মা মৃত্যুর আগে কতটা কষ্ট পেয়ে মরেছে তাই দেখতে।

— শেষবারের মত রাবুর চেহারা একটা বার দেখতে দে। আমি দেখেই চলে যাবো।

— সম্ভব না, কোন অধিকারে দেখতে এসেছেন।

— আমার স্ত্রী ছিলো

— হ্যা কোন এক সময় ছিলো। সেই সম্পর্কটা আপনি নিজেই শেষ করে দিয়েছেন। আপনি জানেন না কোন বেগানা পুরুষের মহিলা মানুষের মৃত্যুর পরে লাশের চেহারা দেখা জায়েজ না হারাম।

আপনি এখন তার স্বামীনা পর পুরুষ। এখন যদি আমার মায়ের মুখ দেখতে দেই তাইলে গুনাহ হবে আমার মার কবরে আজাব পাবে। কথাগুলো আমার না ধর্মের কথা।

— মাফ চাই তোমাদের কাছে মাফ করে দাও।

–জীবনটাকে কি আপনি সিনেমা মনে করেন হাজারো অন্যায় করে একবার মাফ চাইলে ক্ষমা পেয়ে যাবেন। বাস্তব জীবন বড় কঠিন, নির্মম ক্ষমা চাইলেই মাফ পাওয়া যায়না।

আমার মা আপনার সংসারে কিনা করেছে। এখন নাহয় আপনি বড়লোক মানুষ হয়েছেন। এমন একটা সময় ছিলো দুই মাসেও একবার মাংস কিনে খাওয়ার ক্ষমতা ছিলোনা। মা শুধু সারাটা জীবন কষ্টই করে গেছে সুখ নামক পাখিটা একবার উকি দিয়ে গভীর অতলে হারিয়ে গেছে।

মায়ের যখন বিয়ে হয় তেমন কিছুই ছিলো না আপনার একরুম আলা ছোট টিনের ঘর সামনে একটা বারান্দা আর অল্প কিছু জমি।

আপনার ওই ভদ্রবেশী ভালো মানুষের চেহারা দেখে নানা মাকে আপনার সাথে বিয়ে দিয়েছিল। জমিতে ধান চাষ করার গরু ছিলনা, কামলা রাখার ক্ষমতা ছিলোনা। মানুষ দেখলে আপনার সম্মানের হানী হবে তাই রাতের আধারে মা আর আপনি লাঙ্গল টানতেন। আপনি ধানের বিচ ফেলাতেন মা লাঙ্গল টানতো।

বাবার বাড়ি ধনী হওয়া সত্বেও কোন দিন কারো কাছে সাহায্য চাইনি।
এক বেলা খাবার খেলে অন্য বেলা না খেয়ে থাকতো শুধু আপনার সংসারে খরচ কমানোর জন্য। বছরে দুইটা ভালো শাড়ি কিনে দিতেও পারেননি।

মায়ের মুখে শুনেছি বড় আপু যখন জন্ম হয় বৃষ্টির দিন ছিল। বৃষ্টি হলে চালের ফুটো দিয়ে পানি পরে ঘর ভরে যেত। খাটের উপরও পানি পড়তো মা সারারাত আপু কোলে নিয়ে না ঘুমিয়ে এক কোণায় বসে থাকতো।

নানা মায়ের কষ্ট দেখে সম্পত্তি ভাগ করে মায়ের ভাগের সম্পতি মাকে দিয়ে দিয়েছিলো।

আপনি এখন বড় লোক হয়ছেন, তিনটা বাড়ি, রাইস মিল, ইটের ভাটা, বিঘায় বিঘায় জমির মালিক হয়েছেন,সমাজে নাম, ডাক শুধু আমার মায়ের জন্য।
এখন পর্যন্ত আমার মায়ের সম্পত্তি নিজের নামে রেকর্ড করিয়ে ভোগ দখল করে বসে আছেন।

চারটা মেয়ে হবার কারনে কখনো মায়ের উপর সন্তেষ্ঠ ছিলেন না। একটা ছেলের জন্য মায়ের উপর কম অত্যাচার করেননি উঠতে বসতে কথা শুনাতেন।

বুড়া বয়সে অল্প বয়সি মেয়ে বিয়ে করে মায়ের উপর অত্যাচারের পরিমান বারিয়ে দিলেন।

সারাজীবন কষ্ট করেছে আমার মা আর রেডিমেড রাজা সহ রাজত্ব দিলেন আপনার ছোট বউকে।

ওই মুখ দিয়ে আমার মায়ের মুখ দেখার কথা বলতে লজ্জা করলোনা আপনার।

আমার মায়ের মুখ দেখার কোন অধিকার আপনার নেই। আপনি এখন চলে যেতে পারেন।
আর শুনেন আজ থেকে আমি জানবো আমার শুধু মা না বাবাও নেই। মায়ের সাথে আপনাকেও জীবন্ত দাফন করলাম।

আপনি আমার মায়ের খুনি আর কোন খুনির সাথে আমার সম্পর্ক থাকতে পারেনা।

যাদের বাবা, মা থকেনা তাদের কে এতিম বলে আমি ও এখন থেকে এতিম।

আজকের পর কোনদিন আপনার মুখ দেখবো না আমি। আপনার মরা লাশের ও না। এখন আসতে পারেন আপনি।

বাবাকে মায়ের লাশ দেখতে দেইনি বলে আপুরা হয়তো আমার উপর একটু রাগ হয়েছে। কিন্তু আপু তোরা দূরে ছিলি তোরা দেখিসনি মায়ের নির্ঘুম রাতগুলো কতটা কষ্টের ছিল। আমি দেখেছি প্রতি রাতে চোখের জলধারা। কাঁদতে কাঁদতে চোখে ছানি পড়িয়ে ফেলেছিল। চোখে ঠিক মত দেখতো না। না খেয়ে থাকতে থাকতে শরীরে রক্তশূন্যতা হইছে।

আমি অন্যায় কিছু করিনি উচিত কাজটাই করেছি।

মায়ের জানাজা পড়ানো হয়ে গেছে। খাটিআয় করে লাশ দাফনের জন্য নিয়ে যাচ্ছে। খাটিয়ার সামনে দুলাভাইরা পিছনে বড় মামা আর ছোট মামা। সবাই কলেমা পড়তে পড়তে এগিয়ে যাচ্ছে।

আশহাদু আল্ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহাদাহু লা-শারীকা লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু।

শেষ বারের মত মায়ের চাঁদ মাখা মুখটা পরান ভরে দেখে নিয়েছি। আর কোন দিন মায়ের মুখটা দেখতে পারবো না।

ও মাগো শত কষ্টের মাঝে তোমার মুখটা দেখলে কষ্ট সব দূর হয়ে যেত। এখন আমি কি কোরবো মা..? কষ্টগুলো সব বুকের মাঝে চেপে রাখতে হবে।

আজকের পরে কেউ তো আর সোনামণি বলে ডাকবেনা।

গভীর রাত সবাই ঘুমিয়ে গেছে আমার চোখে ঘুম নাই। অন্ধকার কবরে মা একা ঘুমিয়ে আছে। মায়ের বুকে মাথা না দিলে আমার ঘুম আসেনা, অভ্যাস হয়ে গেছে। বালিশ নিয়ে চলে এলাম মায়ের কররের কাছে। বাড়ির সামানে বকুল তলায় মাকে কবর দেয়া হয়ে। মায়ের কবর জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছি…

দশ মাস দশদিন ধরে গর্ভে ধারন,কষ্টের তীব্রতায় করেছে আমায় লালন।

হঠাৎ কোথায় না বলে হারিয়ে গেলো, জন্মান্তরের বাঁধন কোথা হারালো।

সবাই বলে ঐ আকাশে লুকিয়ে আছে, খুঁজে দেখ পাবে দূর নক্ষত্র মাঝে।

রাতের তাঁরা আমায় কি তুই বলতে পারিস।
কোথায় আছে কেমন আছে মা।

ভোরের তাঁরা, রাতের তারা মাকে জানিয়ে দিস। অনেক কেঁদেছি আর কাঁদতে পারিনা।

গল্পঃবাবার বিয়ে

পর্বঃ০৮

মাথার উপর কারো হাতের স্পর্শ পেয়ে ঘুম ভেঙে গোলো তকিয়ে দেখি বড় আপু চোখ দুইটা লাল করে আমার পাশে বসে আছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে এতক্ষন কেঁদেছে।

— ভোর বেলা সমস্থ বাড়ি তোকে কোথায় খুঁজে পাচ্ছিলাম না। এখানে এসে দেখি মায়ের কবর এর উপর ঘুমিয়ে আছিস।

— মায়ের বুকে মাথা না দিলে ঘুম আসেন। মাকে এখানে একা রেখে ঘরের মধ্যে শান্তি পাচ্ছিলাম না। মা একা কেনো মরে গেলো আমাকে সাথে করে নিয়ে যেতো তাহলে দু’জন এক কবরে, এক সাথে থাকতে পারতাম।
মাকে ছাড়া থাকবো কিভাবে আপু।

আপু টানদিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে, আমিও কাঁদছি।

— জানিস নিশি তোর যেদিন জন্মহয় আমি প্রথম তোকে দেখি। তুই কান্না করছিলি আমি চাচির কাছ থেকে তোকে কোলে নেই কপালে মুখে চুমু দেই। তুই কান্না থামিয়ে আমার দিকে আধো আধো খোলা চোখে মুখের দিকে তাকিয়ে দুই হাত নারিয়ে সেকি খুসি। আমরা তিন বোন আর মা ছাড়া তোকে দেখে কেউ খুশি হয়নি। সবাই ছেলের আসা করেছিল কিন্তু জন্ম হলো মেয়ে তাও আবার গায়ের রং কালো। ফুফুরা বাবার সামনে বসে মাকে কত কথা শোনালো।

ভাবছি পোলা হইবে পোলাতো হইলো না জন্ম নিছে একটা কালা মাইয়া। আগের তিনডা তো ফর্শা সুন্দর ছিলো এইডা দেখি রাইতের লাহান কালা হইছে। ভাইজান তুমি সাদা, ভাবির গায়ের রং সাদা এইডা আইলো কৈর থেক্কা। দেইখা তো মনে হয়না তোমার বাচ্চা। ফুফুদের কথা শুনে বাবা তিন দিন বাসায় আসেনি। মামারা অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে বাবাকে নিয়ে আসে কিন্তু বাবার মনের মধ্যে সন্দেহ থেকে যায়। মায়ের সাথে খুব একটা ভালো ব্যবহার করতো না। আমার চাচা, ফুফুরা কখন তোর সাথে ভালো আচারন করেনি।

আমি তোর নাম রাখি শারমিন নিশি। নিশিতে তোর জন্ম তাই নাম নিশি রাখলাম। গ্রামে শ্যামবর্ণ কে কালো হিসাবে ধরে এখানে কালো মানুষের কোন মূল্য নাই।
বাবা তোর নামে আকিকা দেবে না। আমি আমার মাটির ব্যাংক ভেঙে ফেলি। তেইশত টাকা ছিলো। মার কাছে টাকাগুলো দিয়ে বলেছিলাম আকিকা দিতে। মা আমাকে কাছে টেনে নিয়ে বলেছিল আমি না থেকলে তুই ওরে আগলিয়ে রাখতে পারবি এখন থেকে আমার কোন চিন্তা নাই। ওই দিন আমার টাকা সাথে মায়ের কাছে জমানো টাকা মিলিয়ে ছোট মামাকে দিয়ে একটা খাসি কিনে আনিয়ে তোর আকিকার ব্যবস্থা করি।

তোর কপালে কাজলের টিপ দিলে চাচা,ফুফুরা খুব হাসাহাসি করতো বলতো অর কপালে টিপ দিছিস কেন ঐ কাইল্লা মাইয়ার দিকে কেউ নজর দেবেনা।অথচ আমাদের চার বোনের মধ্যে তোর চেহারা বেশি ভালো, মিষ্টি ভাব বেশিছিলো শুধু শ্যামলা দেখে মাকে কত কথা শোনাতো।

তুই বড় হতে লাগলি চেহারা আর সুন্দর হতে লাগলো। বাবাকে দেখলেই হেসে দিয়ে দুইহাত বারিয়ে দিতি কোলে নেয়ার জন্য। আস্তে আস্তে বাবা ও তোর প্রতি ভালোবাসা সৃস্টি হতে লাগলো। এর পর কেউ কিছু বললে বাবাই উত্তর দিতো।

ছোটবেলায় তুই রাগ করলে আমি তোর কাছে গিয়ে বলতাম আমার দাদাইটা কোই রে ওরে আমার পাখিটা রাগ হইছে। হাত বারিয়ে যখন বলতাম

আয়য়ে কাছে সোনা মনি, আয়রে কাছে জান, তুইযে আমার চোখের তারা, তুইযে আমার প্রান। তোকে নিয়ে গোড়বো আমি সুখেরি জীবন। সাথে সাথে লাফ দিয়ে কোলে আসতি।

মা নেই, তোর বোনরা কি মরে গেছে। ছোট বেলায় তোকে যেমন আগলে রাখতাম এখন থেকে আমি বুক দিয়ে আগলে রাখবো তোকে। মায়ের অভাব কি বুঝতেই দেবো না।

আপু জোর করে ঘরে এনে গোছল করিয়ে নাস্তা খায়িয়ে দিলো।

আজ তিন দিন মা নেই। মসজিদে মিলাদের ব্যবস্থা করা হয়েছে আর বাসাতে এতিম, গরিবদের খাবারের ব্যবস্থা করেছে।
আমিও আজকে এতিম দের সাথে খাবার খাবো ওদের মাঝে বসে পরলাম। ভেবেছিলাম আপুরা রাগ হবে আপুরা দেখি আমার পাশে বসে খাওয়া শুরু করেছে।

আমাকে নিয়ে টানাটানি শুরু হয়ে গেলো। মামারা চাচ্ছে আমাকে তাদের কাছে রাখবে আপুরা কেউ রাজিনা। মেঝো তার কাছে নিয়ে যাবে কিন্তু বড় আপুর এক কথা আমাকে কারো কাছে দেবেনা আপুর কাছে রাখবে।
আমি পড়েছি মহা বিপদে কিছুই মাথায় কাজ করছে না চুপ থাকা বুদ্ধিমানের কাজ যা আছে কপালে।

ডিসিশন হল আমার ঠিকানা এখন বড় আপুর বাসা। মাঝো আপু কাছে থাকবে জমিলা খালা ওনার আপন বলতে আমারা ছাড়া কেউ নাই। বাড়ি দেখাসুনা করবে মুক্তা আপা আর সিদ্দক ভাই ওরা এখানে থাকবে।

আমার তো এখানে মাকে একা রেখে যেতে ইচ্ছে করছে না। মাগো তুমি বেঁচে থাকলে আমাকে দোটানা মধ্যে পরতে হতো না।

শুধু একটা মানুষ নাই এ কদিনে কত কি ঘটেগেলো।

মায়ের অভাব আস্তে আস্তে বুঝতে পারছি।

বড় দুলাভাই কলেজ থাকে আমার বদলির সব ব্যবস্থা করে ফেললো।

খুলনা আসার আগে মায়ের কবরের সামনে দোয়া পড়ে কবর টা জিয়ারত করে আসলাম। আবার কবে গ্রামে আসবো তা জানিনা।

খুলনা নিয়ে সিটি কলেজে ভর্তি করিয়ে দিলো।রেজাল্ট ভালো থাকার কারনে ভর্তি হতে কোন বেগ পেতে হইনি।

গ্রামের কাদামাটি জীবনের ইতি ঘটিয়ে শুরু হলো আমার ইট-পাথরের শহুরে জীবন। আপু খুব পরিপাটি করে আমার রুমটা সাজিয়েছে সব কিছু নতুন জিনিসপত্র এমন কি পানি খাবার গ্লাসটাও।

আজকে আমার এই কলেজে প্রথম ক্লাস আপু, দুলাভাই সাথে করে নিয়ে গেছে। গ্রাম থেকে এসেছি শুনে সবাই একটু ভ্রুকুচকে তাকিয়ে ছিলো।

স্যার যখন জিজ্ঞেস করলো ম্যাট্রিক এ রেজাল্ট কি..??

আমার রেজাল্ট শুনে সবাই অনেক অবাক হয়েছিল। ওদের ধারনা ছিলো গ্রামের স্টুডেন্টরা ভালো রেজাল্ট করতে পারেনা। এর মধ্যে কয় একজনের সাথে আমার ভালো বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে।
ক্লাসের বেলি নামের মেয়েটা আমাকে খুব একটা পছন্দ করে না আমার উপর রেগে আছে কারন ওর ঘনিষ্ঠ বন্ধুগুলো আমার মিসে। আমি যে বেঞ্চিতে বসলে বেলি ওই বেঞ্চে বসে না জানিনা কেনো।

দিনশেষে রাতে বেলা মায়ের কথা খুব মনেপড়ে মুখটা চোখোর সামনে ভেসে আসে।

আমাদের কলেজে একজন বয়স্ক মহিলা আসে বাদাম বিক্রি করতে। আমরা খালাকে পছন্দ করি উনার কাছ থেকে বাদাম কিনে খাই কিন্তু বেলি উনাকে একদমি সহ্য করতে পারেনা। খালার কাছ থেকে কেনা বাদাম খাওয়া তো দূরে থাক ছোঁয় ও না। তিথি, জারা ওদের কারনে বেলি আমার সাথে মিসলেও আমার থেকে দুহাত দূরে থাকে।

বাহিরে প্রচন্ড বৃষ্টি ক্লাসে বসে আছি। স্টুডেন্ট কম থাকায় ক্লাস হয়নি তাই সবাই মিলে ডিসিশন নিলাম ফুচকা খেতে যাবো

বৃষ্টির কারনে রাস্তা পিচ্ছল হয়ে আছে। রাস্তার সাইড দিয়ে আমরা পাঁচজন হেটে যাচ্ছি। হাটার সময় বেলি স্লিপ খেয়ে পড়ে যাওয়ার সময় আমি ওর হাতটা ধরে ফেলি। বেলী এক ঝাটকা দিয়ে আমার হাতটা সরিয়ে ফেললো। সবাই ওর কান্ড দেখে অবাক। আমি কেন ওর হাত ধরেছি এখন ওর শরীর ঘিন ঘিন লাকছে। আমার কালো হাত দিয়ে কেনো ওকে স্পর্শ করেছি বেলি সাতদিনেও নাকি ওর হাত দিয়ে কিছু খেতে পারবেনা। আমি কিছুক্ষন ওর মুখের দিকে তকিয়ে ছিলাম। বেলি কালো মানুষদের অনেক ঘৃনা করে। এতদিনে বুঝলাম আসল কাহীনি কলেজের খালাকে কেন পছন্দ করতো না, কেন ওনার কাছ থেকে কেনা বাদাম খেতোন শুধু কালো বলে। খালার গায়ের রং আমার মত কালো।
বেলি যে অনেক ফর্শা তাওনা উজ্জ্বল ফর্সা। বেলির কান্ডকারখানা দেখা সবাই হতবাগ। দোকান থেকে সাবান কিনে হাত ধুচ্ছে।

খুব কষ্ট লাকছে কালো মানুষ কি মানুষ না। মানুষ হল আসরাফুল মাকলুকাত পৃথিবীর সেরা জীব কিন্তু মানুষেত আচরন যদি পশুদের মত হয় তাকে কি মানুষ বলা যায়
গায়ের রং কালো দেখে যারা মানুষকে অসম্মান করে, ভালোবাসতে জানে না। তাদের মত মানুষ কে দেখলে আমার ও ঘৃনা লাগে।

আজ মায়ের কথা খুব মনে পড়ছে। কই আমি কালো ছিলাম আমার মায়ের তো কখন আমাকে ঘৃনা লাগেনি। কত হাজার চুমু খেয়েছে মুখে। আমি ছিলাম মায়ের কাছে পৃথিবীর সব থেকে সুন্দর মানুষ। মা আমার মুখের দিকে সব সময় তাকিয়ে থাকতো। মা নাকি বাগানে ফুটে থাকা টকটকে লাল গোলাপের দিকে তাকিয়ে আছে। সন্তানের প্রতি মায়ের ভালোবাসা কি কালো / ফর্শাতে বিচার করে।

মন খারাপ করে বাসায় চলে আসলাম। এসে দেখি চাচা এসেছে। আপুর কাছে শুনলাম বাবার একটা মেয়ে হয়েছে।

গল্পঃবাবার বিয়ে

পর্বঃ০৯

আপুর কাছে সুনলাম বাবার একটা মেয়ে হয়েছে কিন্তু প্রতিবন্ধী। শুনে খুব খারাপ লাগলো বাবা, ছোট মা যাই করুক না আমাদের সাথে বাচ্চাটার কোন দোষ নেই নিঃশপাপ।

আজকে সালমান ভাইয়ের বিয়ে। সালমান ভাই হল বড় আপুর চাচাতো দেবর ছোট আপুর সাথে উনার সাত বছরের রিলেশন ছিল। আমরা ব্রোকেন ফ্যামিলির মেয়ে বলে সালমানদের ফ্যামিলি কেউ এই বিয়েতে রাজি না। সালমান ভাইও আপুকে ফিরিয়ে দিয়েছে কারন একেতো ব্রোকেন ফ্যামিলি তার উপর বুড়ো বয়সে বাবা বাচ্চা হয়েছে। আপুকে বিয়ে করলে সমাজে মুখ দেখাতে পারবে না। এতটা বছর ভালোবাসার নামে মিথ্যা অভিনয় কি দরকার ছিলো। বাবা বিয়ে করেছে ছয় বছরের বেশি তখন কেনো রিলেশনটা ভেঙ দিলোনা তাহলে তো আপুকে এত কষ্ট পেতে হতোনা। ছোট আপু অনেক ভেঙে পড়েছে আমার খুব কষ্ট হচ্ছে আপুর কষ্ট দেখে।

হয়তোবা ব্রোকেন ফ্যামিলির জন্য কতশত মানুষের স্বপ্ন ভেঙে যায়।

মন ভাঙা আর মসজিদ ভাঙা সমান কথা। উপরে আল্লাহ আছে তিনিই বিচার করবে।

কাল গ্রামে যাবো মায়ের কবর জিয়ারত করতে। ওখানে গেলে হয়তো আপুর মন ভালো হয়ে যেতে পারে।।

বাসায় নতুন কাজের বুয়া রাখা হোয়েছে বাসার দারোয়ান কাসেমের স্ত্রীকে।

ওনাদের দুইটা বাচ্ছা ছেলেটার বয়স ছয় বছর হবে আর মেয়েটার তিন।

এতদিন আমি একটা জীনিস খেয়াল করে দেখলাম। কাজের বুয়া দুইটা বাচ্চাকে সাথে নিয়ে কাজ করতে আসে। মেয়েটাকে ফ্লরে বসিয়ে রাখে কিন্তু ছেলেটাকে কোলে নিয়ে কাজ করে। ছেলেটাকে এক মিনিট এর জন্য কোল থেকে নামায় না ওনি না পারলে কাশেমের কাছে দিয়ে আসে আর মেয়ে বাচ্চাটা কান্না করলেও ফিরেও তাকায় না উল্টা গায়েও হাত তোলে।

বুয়াকে প্রতিদান দুপুরে খাবার দেওয়া হয়। ওনাকে দেখি মাছ, মাংস যা ই দেইনা কেন প্রথমে ছেলেটাকে আগে মাছ, মাংস দিয়ে ভাত খাওয়ানোর শেষ প্লেটে ঝোল দিয়ে মাখানো খালি ভাতগুলো মেয়েটা কে খাওআয়।

উনাদের স্বামী -স্ত্রী কান্ডকারখানা দেখে আমি হতবাগ। এরা জি জন্মদাতা পিতামাতা নাকি অন্য কিছু।

আপুকে বলে দিয়েছি ছোট বাচ্চা মেয়েটাকে আলাদা করে খাবার দিতে। বাচ্চাটার মুখের দিকে তাকালে মায়া লাগে দেখেই বোঝা যায় অযত্ন অবহেলায় অপুষ্টি জনিত সমস্যায় ভুকছে।

ধনী, গরিব, শিক্ষক, অশিক্ষীত সব খানেই কন্যা সন্তানরা অবহেলিতো।

কাজের বুয়ার সাথে কথা বলে বুঝতে পারলাম ওনি ওনার পরিবার থেকে শিখে এসেছে। ওনার পরিবার ও কন্যা সন্তানের সাথে এই একি আচারন করেছে।

তাদের ভাষ্য মতে মেয়ে বিয়া দিলে পরের ঘরে গিয়া পর হইয়া যাইবে। পোলা তো আর পর হইবেনা ঘরের পোলা ঘরেই থাকবে। বুড়া বয়সে আমাগো দেখভাল করবে। আমরা যদি পোলারে না খাওয়াই তাইলে পোলায় কি আর আমগো বুড়া বয়সে খাওয়াইবে।

একটা বার ও চিন্তা করলো না। কয় দিন পরে বিয়ে দিলে মেয়েটা শ্বশুর বাড়ি চলে যাবে। স্বামী, শ্বশুরবাড়ির লোকেরা ভালোবাসবে তার গ্যারান্টি কে দেবে তারাতো এর থেকে বেশি অত্যাচার করতে পারে। আপনার মেয়ে সন্তানটা জীবনে কি পেলো না বাবা-মেয়ের ভালোবাস না স্বামী সংসারে শান্তি।

কাজের বুয়াকে অনেক বুঝালাম জানিনা লাইবা নামের মেয়েটা সুখের দেখা পাবে কিনা নাকি অবহেলা অনাদরে বড় হবে..?

রাখে আল্লাহ মারে কে আল্লাহ যদি সহায় হয় কার সাধ্য আছে মুখ ফিরিয়ে নেবার। ছোট আপুর বিয়ে ঠিক হয়েছে আপুর ভার্সিটির শিক্ষকের সাথে। ওনারাই বাসায় বিয়েত প্রস্তাব নিয়ে আসে এই শুক্রবার বিয়ে। আত্নীয়স্বজন সাবাই আসা শুরু করেছে। বাবারর বাড়ির কেউ বিয়েতে আসবে না। মামারা সবাই চলে এসেছে।

বিয়ে উপলক্ষে আমাদের তিন বোনের একি রকম ম্যাচিং করা ড্রেস কিনেছি। দুলাভাই আর বাবুদের একি রকম ড্রেস তৈরি করতে দিয়েছি।

অবশেষে কোন ঝামেলা ছাড়া আপুর বিয়েটা হয়ে গেলো সবাই খুব খুশি।

মেয়ে তুমি মানে… একটা সময় আপন মানুষরা হয়ে যাবে পর আর অপরিচিত মানুষ গুলো হয়ে যাবে আপন। বাবার বাড়ি ছেড়ে যেদিন তুমি স্বামী বাড়ি চলে যাবে ওটাই হবে তোমার আপন ঠিকানা।

আপুর বাসার পাশের ফ্লাটের ভাবি কে সবাই বিবিসি বাংলার সাংবাদিক বলে ডাকে ওনার কাজ হলো এলাকায় কোথায় কি ঘটছে তা নিয়ে আলোচনা – সমালোচনা করা। এক জনের কথা অন্য জনেরে কানে লাগানো। উনি বেশকিছু দিন ধরে
ঘন ঘন আমাদের বাসায় যাতায়াত করছে মতলবটা বুঝতে পারছি না।

আমার রুমে বসেই ওদের সব কথা শোনা যাচ্ছে।

— নাজিয়ার বিয়েটা হয়ে গেলো ভাবি আমার খুব ইচ্ছা আপনাদের সাথে আত্নিয় করার। ভেবেছিলা নাজিয়া কে আমার ছোট ভায়ের জন্য বউ করে নেব কিন্তু তার আগেই ওর বিয়ে ঠিক করে ফেললেন। ভাবি একটা কথা জিঙ্গেস করি নিশি কি আপনার মায়ের পেটের বোন..?

— ভাবি এই কথা কেন বললেন। আমারা মায়ের পেটের আপন চার বোন। হ্যা নিশি আমার আপন বোন।

— না আসলে কিছু মনে কইরেন না নিশিকে দেখলে মনে হয়না আপনাদের বোন চেহারায় কোন মিল নাই। আপনারা তিন বোন দেখতে অনেক সুন্দর কি ফর্শা আর নিশির গায়ের রং ময়লা। এই বাজারে কালো মেয়েদের কোন দাম নাই। নাজানি বিয়ে দিতে কত ভোগান্তি শিকার হতে হয়।

— এটা আমাদের বিষয় আপনাকে ভাবতে হবে না। শ্যামলা দেখে কি আমার বোন পানিতে পরে গেছে। গায়ের রং ফর্শা হলেই বুজি আপনাদের কাছে সে সুন্দর হয়ে যায়। আমাদের চার বোনের মধ্যে নিশির চেহারা সবথাকে দেখতে সুন্দর, লাবন্য ভাব বেশি।

— কি জে বলেন ভাবি কালা মাইয়ার কোন দাম আছে নাকি। ছেলে মানুষ হইলো খাটি হীরা কালা, ফর্সা সবি সমান। আমার ভাই কিছু দিনের মধ্যে বাহিরে যাবে সোনার টুকরা ছেলে। ভাবি আপনাদের খুব মনে ধরেছে আপনারা যদি চান নিশির বিষয় ভেবে দেখতে পারি। তবে কথা হল কালা মাইয়া বোঝেন তো শ্বশুর বাড়ীর লোকেদের মন জয় করতে হবে।

— নিশিকে এত সকালে বিয়ে দেবার কোন ইচ্ছা নাই। আমাদের সবার ইচ্ছা ও ডাক্তারি পড়বে।

— কালা মাইয়া এত পড়িয়ে কি লাভ বয়স থাকতে বিয়ে দিয়ে দেন পরে কিন্তু পস্তাবেন পাত্র খুঁজে পাবেন না। আমার ভাই পাত্র হিসাবে খুব ভালো। আপনাদের ছেলেরে তেমন কিছু দেওয়া লাগবে না সুইডেন যাবার খরচটা দিলে হবে। আর মেয়েপক্ষরা এমনিতে ঘর সাজিয়ে দেয় উপহার হিসাবে ঘরটা সাজিয়ে দিলেন হবে।

— ভাবি আপনি এখন আসতে পারেন আমার বোনের গায়ের রং নিয়ে আমরা অখুসিনা। আপনার সোনার টুকরা ভাইকে অন্য কোথাও বিয়ে দিয়ে সোনার হরিন নিয়ে আসেন। আপনি যে শিক্ষীত আপনার কথায় তা বোঝ যায়না মন মানুসিকতা চেইঞ্জ করেন। আর কোন কথা না এবার আসেন।

নিজের অজান্তে বুকচিরে একটি দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। এতখুন আপুর আর পাশের বাসার ভাবির কথা শুনতে ছিলাম। এতদিন মেয়ে হয়েছি দেখে কথা শোনা লাকতো এখন কালো মেয়ে বলে অপমানিত হতে হয়। আল্লাহ আর কত ছোট করবে মানুষের কাছে। আল্লাহ গো ধৈর্য ধরার শক্তি দেও যেন হতাস হয়ে কোন ভুল কাজ না করে বসি।

কিছু দিন আগে একটা কবিতা শুনেছিলাম।

আমি এক সাধারন মেয়ে রং যদিও কালো

চোখ কালো হরিন ন্যায় লোকে বলে দেখতে বেশ ভালো।

শুনেছি যেদিন নাকি জন্মেছিলাম , ঠাকুর মার মাথায় ছিল হাত বিলাপ করে বলেছিল করবো কি করে এই মেয়ে কে পাড়।

যেমন যেমন বয়স বাড়ে কাঁটছে তো সময় মেলা। সবার চোক্ষে দেখতে পাই রংটার অবহেলা।

যেই আসছে সেই দিচ্ছে উপদেশের পাহাড় কোলা মেয়ের কেমন হবে আচার বিচার..

ইন্টার পরীক্ষার রেজাল্ট দিয়েছে আমি এ প্লাস পেয়েছি। থ্রি ডক্টরস মেডিকেল কোচিং ভর্তি হয়েছি পড়াশুনার অনেক চাপ সাতমাস হলো গ্রামে যাইনা। কতদিন মাকে দেখিনা মা খুব রেগে আছে।

আজ নয় মাস পরে মায়ের কবর
জিয়ারত করছি, রাব্বিল হাম হুমা কামা রাব্বায়ানিস সাগিরা। মা আমি ডাক্তারিতে চান্স পেয়েছি খুলনা মেডিকেল কলেজে।

মাগো তোমাকে দেখতে আসিনা এই জন্য তুমি খুব রাগ হয়ে আছো। আমি তো তোমার স্বপ্ন পুরোন করার জন্য আসতে পারিনি। কতদিন তোমায় মুখটা দেখিনা আগেতো রোজ স্বপ্নে দেখা দিতে এই কয়টা মাস একবার ও আসোনি। প্রতিদিন রাতে অপেক্ষায় থাকি তুমি আসবে কিন্তু তুমি তো আসোনা। আমার ঘুম ভেঙে যায় নিঃশ্বাস নিতে পারিনা মা খুব কষ্ট হয়।

মাগো আমি তোমায় একবার দেখতে চাই, একবার কথা কইতে চাইগো মা।

তুমি কথা বলবেনা আমার সাথে…?

গল্পঃবাবার বিয়ে

পর্বঃ১০

মধুর আমার মায়ের হাসি চাঁদের মুখে ঝরে মাকে মনে পরে আমার মাকে মনে পরে।

দেখতে দেখতে আঠারোটি বছর কেটে গেল। আজ মায়ের আঠারো তম মৃত্যু বার্ষিকী এই দিনটাতে মা আমাদেরকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন দূর আকাশে।

চোখ বন্ধ করলে মায়ের হাসি মাখা মুখটা ভেসে আসছে। মা আজ অনেক খুসি হয়তো এই দিনটার জন্য অপেক্ষা করেছিলেন।

মায়ের কররের সামনে দাড়িঁয়ে আছি।

মাগো তুমি দেখতে পাচ্ছ, আজ তো তোমার গর্ব করার দিন। তোমার মনের আসা পুরন করেছি। তুমি না সব সময় বলতে আমাদের গ্রামে একটা হাসপাতাল থাকলে ভালো হতো। দেখ মা গ্রামে তোমার নামে হাসপাতাল তৈরি করেছি। এখানে গরীব অসহায় লোকদের বিনামূল্যে চিকিৎসা প্রদান করা হবে। গ্রামের মানুষ সবাই খুব খুশি । এখন আর কাউকে বিনা চিকিৎসা মরতে হবে না। আর অসুস্থ রোগিদের চিকিৎসার জন্য শহরে নেবার পথে মারা যাবে না।

মাগো শুধু হাসপাতাল না, গ্রামের তোমার নামে বড়, মেঝো আপু আর ছোট আপু মিলে কলেজ তৈরি করেছে। এখন আর ছাত্র -ছাত্রী দের কষ্ট করে সাত মাইল দূরের কলেজে পড়তে যেতে হবে না।

আমি চোখ বন্ধ করলেই তোমার চাঁদমাখা মুখটি দেখতে পাচ্ছি।
তুমি অনেক খুসি হয়েছো তাইনা।

জানিনা কোন ভালো কাজের জন্য আল্লাহ আমাকে এতবড় পুরস্কার দিয়েছে। তুমি মারা যাবার পরে প্রতিদিন তোমার জন্য কাঁদতাম আর মনে মনে বলতাম আল্লাহ যেন তোমাকে আমার কাছে ফিরিয়ে দেয়।
মা দেখ আল্লাহ আমার কথা শুনেছে সত্যি সত্যি তোমাকে আমার কাছে ফিরিয়ে দিয়েছে। এই দেখো আমার মেয়ে হিয়া দেখতে অবিকল ঠিক তোমার মত হয়েছে। ওর মাঝে এখন আমি তোমাকে খুঁজ পাই।

কখনো ভাবিনি আমার কপালে এত সুখ লিখেছে আল্লাহ। কালো দেখে সবাই যখন অবজ্ঞা করতো খুব ডিপ্রেশনে ভুগতাম। আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম সুখের পাখিটা আমার জীবনে দেখা দেবেনা। সারাজীবন হয়তো আমাকে একাই থাকা লাগবে। নিজেকে সেভাবে তৈরি করতেছিলাম।

২০০৯ সালে ২৫ মে দক্ষিণ- পশ্চিম অঞ্চলে আঘাত আনে ঘূর্নিঝড় আয়লা। এই ঝড়ে হাজারের ও বেশি মানুষ মারা যায় ।

সাতক্ষীরা উপকূলে মানুষ সবথেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ৫৯ জন মানুষ মৃত্যু বরন করে আহত হয় সাত হাজারের ও বেশি মানুষ। আয়লায় ক্ষোতিগ্রস্ত হয় তিন লক্ষ এর ও বেশি মানুষ।

আমরা মেডিকেলে টিম নিয়ে যাই সাতক্ষীরা উপকূলে চিকিৎসা প্রদানের জন্য। মেজর আবির আদনান সাথে ওখানে বসে পরিচয় হয়। ওরা ক্ষোতিগ্রস্তদের জন্য ত্রাণ নিয়ে এসেছিল।

শুরু হয় একসাথে দু’জনের এক সাথে পথ চলা বন্ধুত্ব প্রেম-ভালোবাসা তারপর বিয়ে।

একটা সময় আমার চোখ দিয়ে পানি বের হত কষ্টে। আর এখন ও আমার চোখ দিয়ে পানি বের হয় তবে সুখের । শুধু কষ্টে মানুষ কাদে না সুখেও কাঁদে। এই মানুষটা আমাকে এত বোঝে ওরে কখন মুখ ফুটে কিছু বলতে হয় না। আমার চোখ দেখে বুঝে নেয় আমার চাওয়া পাওয়া গুলো।

আদনানের দুচোখে আমার জন্য অফুরন্ত ভালোবাস দেখেছি। আমার মাঝে মাঝে প্রশ্ন জাগে একটা মানুষ কিভাবে এত ভালোবাসতে পারে।

ঘর পোড়া গরু যেমন আকাশে সিঁদুর দেখলে ভয় পায়। আমার খুব ভয় হয় মা, এত সুখ আমার কপালে সোইবে তো।

মাগো তুমি মরে যাবার পরে বড় আপু আমাকে কখনো বুঝতে দেইনি আমার মা নেই। বুক দিয়ে আগলে রেখেছে একদিকে বোনের স্নেহ অন্যদিয়ে মায়ের ভালোবাস আপু একাই আমাকে দিয়েছে। আর এখন আদনান একটা সুখের স্বর্গ উপহার দিয়েছে ও আমাকে অনেক ভালোবাসে।

জানো মা আমার মেয়েটা বড় আপুকে ছাড়া কিছুই বোঝেনা। সবাই ভবে আমি না বড় আপু হিয়ার মা। আমি যদি মরেও যাই আমার কোন দুঃখ থাকবে না, কোন চিন্তা থাকবে না বড় আপা কোন দিন মায়ের অভাব বুঝতে দেবেনা। আমাকে যেমন ভালোবাস দিয়ে আগলে রাখেছে হিয়াকেও একি ভাবে রাখবে।

মাগো আমি অনুসূচনা শেষ হয়ে যাচ্ছি। আমি রাগ হয়ে বাবাকে বলেছিলাম মৃত্যুর পরেও বাবার মুখ দেখবোনা। আল্লাহ সত্যি আমার মনের আসা পুরোন করেছে। আমি মৃত্যু আগে সত্যি বাবার মুখতা দেখতে পারিনি।

সিঙ্গাপুরে দুই সপ্তাহের জন্য কনফারেন্স গিয়েছিলাম।

আমি অনেক বেশি অন্যায় করেছি বাবার সাথে শত হলেও সে আমার জন্মদাতা পিতা ছিলো। তবে মনে একটাই সান্তনা আপুরা কেউ মুখ ফিরিয়ে নেয়নি।

মা আমি তোমার কাছে পারমিশন চাই গত দুই বছর হলো বাবা মারা গেছে আমি একবার ও বাবার কবর জিয়ারত করতে যাইনি। আমি যেতে চাই।

খন্দকার বাড়ির আগের ধন জৌলাশ আর নাই। এই বিশটা বছরে অনেক পরিরর্তন ঘটেছে। খন্দকার বাড়ি এখন অন্ধকার বাড়িতে পরিনত হয়েছে।

বাবা কত দিন দেখিনা তোমায়। কেউ বলেনা মানিক কোথায় আমার বুকে আয়।
দেখতে দেখতে কখন যে বিশটি বছর পার হয়ে গেলো। গত বিশটি বছর একবারের জন্য আদর পাইনি বাবাকে বাবা বলে ডাকতে পারিনি, কখনো বাবার পরম স্নেহের হাতটি আমায় মাথায় বুলিয়ে দিতে দেখিনি।একবারের জন্য বলতে পারিনি আমিও বাবা তোমার সাথে সুখ, দুঃখের ভাগিদার হতে চাই। আমার সামনে যখন কোন বন্ধুদের তার বাবার গল্প করতে শুনি তখন বুকের এক কোনে কেমন যেন ব্যথা অনুভব হয়। ব্যথাটা কেমন বুঝতে চাই কিন্তু পারিনা বাবা।

কোনটা বাবার কবর চেনা যাচ্ছে না। কবরে উপর ঘাস লতাপাতা হয়ে ভরে গেছে। কবরের উপরে গরু,ছাগল ঘাস খাচ্ছে। বাবা তোমাত বংশের প্রদীব কোথায় যার জন্য এত কিছু ঘটে গেলো। যার জন্য তুমি এত স্বার্থপর বনে গেলে।

তোমার ছেলে,তোমার বংশ প্রদীপ কি তোমার মান সম্মান ধোরে রাখতে পেরেছে বাবা..?

খোঁজ নিয়ে জানলাম। ইটের ভাটাটা তোমার শালারা দখল করে নিয়েছে। রাইসমিলটা ম্যানেজার চাচা কিনে নিয়েছে। তোমার নামের জমি জমা কিচ্ছু নেই সব তোমার গুনধর ছেলে বিক্রি করে জুয়া খেলে, নেশা করে, শেষ করে ফেলেছে,এখন যাত্রাপালার মেয়েদের নিয়ে পরে থাকে। এখন শুধু এই বাড়িটাই সম্বল কবে যেন এটাও বিক্রি করে দেয়। তুমি নিজের চোখে দেখ গিয়েছিলে তোমার ছেলের অধঃপতন। ঐ ছেলের জন্য তুমি হার্ড এট্যাক করলে। ছেলে ছেলে করে তুমি আমাদেরকে পর করে দিলে আর সেই ছেলেই তোমাকে মৃত্যু দিকে ঠেলে।

শুনেছি ছোট মায়ের ক্যান্সার হয়েছে। বিনাচিকিৎসা মৃত্যু পথযাত্রী তাকেও বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে তোমাদের ছেলে। ছোট মা তার ভাইদের কাছে গিয়েছিল তারাও দূর দূর করে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে।কেউ জানেনা এখন কোথায় আছে।

তোমার মেয়েরা না থাকলে হয়তো তোমার ছোট মায়ের মত করুন পরিনতি হতো। আপুরা তোমার চিকিৎসা, সেবা যত্ন সবকিছু করেছিলো। মনে শুধু এতটুকু সান্তনা মৃত্যু আগে তুমি তোমার মেয়েদের ভালবাসা পেয়ে মৃত্যুবরন করেছিলে।

বাবা তোমার তো নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করা উচিত ছিলো কারন আমার নবীজির ও চারটা কন্য ছিলো আর তোমার ও চারটা কন্য সন্তান ছিলো। বাবা তুমি আমার নবীজির আদর্শ মেনে চলনি। তুমি যদি নবী করিম (সাঃ) এর আদর্শ মেনে চলতে তাইলে জীবন এমন হতো না।

বাবা তোমার মান সম্মান ধুলায় মেশেনি। তোমার বংশ তোমার ছেলে রক্ষা করতে না পারলেও তোমার মেয়েরা পেরেছে। মানুষ তোমার মেয়ের জন্য তোমাকে সম্মান করেবে। এখন দ্বায়িত্ব বাবার আগের সম্মান ফিরিয়ে দেওয়া।লোকাজন ঠিক করেছি বাবার বন্ধ হওয়া মসজিদ, মাদ্রাসা ঠিক করে পুনোরায় আবার চালু করবো।

যদি সঠিক ভাবে গোড়তে পারে তাহলে ছেলে আর মেয়ে কি দু’জনে সমান।মেয়েরাও পারে বাবা মায়ের সম্মান বৃদ্ধি করতে। বুড়ো বয়সে বাবা-মায়ের চলার পথে লাঠি হতে।

মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেস্ত কত বড় সম্মানের আসনে আল্লাহ নারীদের কে দিয়েছে। আমার মানুষরাই নারীদের সম্মান করতে জানিনা।

সাম্যের গান গাই
কাজী নজরুল ইসলাম

আমার চক্ষে পুরুষ- রমনী কোন ভেদাভেদ নাই। বিশ্বের যা কিছু মহান সৃস্টি চির কল্যান কর অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।

বিশ্বে যা কিছু এল পাপ-তাপ বেদনা অশ্রুবারি
অর্ধেক তার আনিয়াহে নর, অর্ধেক তার নারী।নরকুন্ড বলিয়া কে তোমা করে নারী হয়ে জ্ঞান?তরে বলে আদি পাপি নারী নহে সে যে নর শয়তান।অথবা পাপ যে -শয়তান যে- নর নহে নারী হনে ক্লীব সে, তাই সে নর ও নারীতে সমান মিশিয়ে রহে।

এ বিশ্বে যত ফুটিয়াছে ফুল, ফলিয়াছে যত ফল।নারী দিল তাহে রুপ- রশ- মধু- গন্ধ নির্মল। তাজমহলের পাথর দেখেছো, দেখিয়াছো তার প্রান। অন্তরে তার মোমতাজ নারী – বাহিরেতে শা-জাহান।

   ******সমাপ্ত****-*

যদি শেয়ার ও কমেন্ট করে পাশে থাকেন তাহলে খুব তাড়াতাড়ি আসবো নতুন গল্প নিয়ে।আসা করি পাশে থাকবেন।

28 COMMENTS

LEAVE A RESPONSE

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।