বাবার বিয়ে(শেষ পর্ব)নুসরাত মাহিন

গল্পঃবাবার বিয়ে(পর্বঃ১০)

লেখাঃনুসরাত মাহিন

মধুর আমার মায়ের হাসি চাঁদের মুখে ঝরে মাকে মনে পরে আমার মাকে মনে পরে।

দেখতে দেখতে আঠারোটি বছর কেটে গেল। আজ মায়ের আঠারো তম মৃত্যু বার্ষিকী এই দিনটাতে মা আমাদেরকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন দূর আকাশে।

চোখ বন্ধ করলে মায়ের হাসি মাখা মুখটা ভেসে আসছে। মা আজ অনেক খুসি হয়তো এই দিনটার জন্য অপেক্ষা করেছিলেন।

মায়ের কররের সামনে দাড়িঁয়ে আছি।

মাগো তুমি দেখতে পাচ্ছ, আজ তো তোমার গর্ব করার দিন। তোমার মনের আসা পুরন করেছি। তুমি না সব সময় বলতে আমাদের গ্রামে একটা হাসপাতাল থাকলে ভালো হতো। দেখ মা গ্রামে তোমার নামে হাসপাতাল তৈরি করেছি। এখানে গরীব অসহায় লোকদের বিনামূল্যে চিকিৎসা প্রদান করা হবে। গ্রামের মানুষ সবাই খুব খুশি । এখন আর কাউকে বিনা চিকিৎসা মরতে হবে না। আর অসুস্থ রোগিদের চিকিৎসার জন্য শহরে নেবার পথে মারা যাবে না।

মাগো শুধু হাসপাতাল না, গ্রামের তোমার নামে বড়, মেঝো আপু আর ছোট আপু মিলে কলেজ তৈরি করেছে। এখন আর ছাত্র -ছাত্রী দের কষ্ট করে সাত মাইল দূরের কলেজে পড়তে যেতে হবে না।

আমি চোখ বন্ধ করলেই তোমার চাঁদমাখা মুখটি দেখতে পাচ্ছি।
তুমি অনেক খুসি হয়েছো তাইনা।

জানিনা কোন ভালো কাজের জন্য আল্লাহ আমাকে এতবড় পুরস্কার দিয়েছে। তুমি মারা যাবার পরে প্রতিদিন তোমার জন্য কাঁদতাম আর মনে মনে বলতাম আল্লাহ যেন তোমাকে আমার কাছে ফিরিয়ে দেয়।
মা দেখ আল্লাহ আমার কথা শুনেছে সত্যি সত্যি তোমাকে আমার কাছে ফিরিয়ে দিয়েছে। এই দেখো আমার মেয়ে হিয়া দেখতে অবিকল ঠিক তোমার মত হয়েছে। ওর মাঝে এখন আমি তোমাকে খুঁজ পাই।

কখনো ভাবিনি আমার কপালে এত সুখ লিখেছে আল্লাহ। কালো দেখে সবাই যখন অবজ্ঞা করতো খুব ডিপ্রেশনে ভুগতাম। আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম সুখের পাখিটা আমার জীবনে দেখা দেবেনা। সারাজীবন হয়তো আমাকে একাই থাকা লাগবে। নিজেকে সেভাবে তৈরি করতেছিলাম।

২০০৯ সালে ২৫ মে দক্ষিণ- পশ্চিম অঞ্চলে আঘাত আনে ঘূর্নিঝড় আয়লা। এই ঝড়ে হাজারের ও বেশি মানুষ মারা যায় ।

সাতক্ষীরা উপকূলে মানুষ সবথেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ৫৯ জন মানুষ মৃত্যু বরন করে আহত হয় সাত হাজারের ও বেশি মানুষ। আয়লায় ক্ষোতিগ্রস্ত হয় তিন লক্ষ এর ও বেশি মানুষ।

আমরা মেডিকেলে টিম নিয়ে যাই সাতক্ষীরা উপকূলে চিকিৎসা প্রদানের জন্য। মেজর আবির আদনান সাথে ওখানে বসে পরিচয় হয়। ওরা ক্ষোতিগ্রস্তদের জন্য ত্রাণ নিয়ে এসেছিল।

শুরু হয় একসাথে দু’জনের এক সাথে পথ চলা বন্ধুত্ব প্রেম-ভালোবাসা তারপর বিয়ে।

একটা সময় আমার চোখ দিয়ে পানি বের হত কষ্টে। আর এখন ও আমার চোখ দিয়ে পানি বের হয় তবে সুখের । শুধু কষ্টে মানুষ কাদে না সুখেও কাঁদে। এই মানুষটা আমাকে এত বোঝে ওরে কখন মুখ ফুটে কিছু বলতে হয় না। আমার চোখ দেখে বুঝে নেয় আমার চাওয়া পাওয়া গুলো।

আদনানের দুচোখে আমার জন্য অফুরন্ত ভালোবাস দেখেছি। আমার মাঝে মাঝে প্রশ্ন জাগে একটা মানুষ কিভাবে এত ভালোবাসতে পারে।

ঘর পোড়া গরু যেমন আকাশে সিঁদুর দেখলে ভয় পায়। আমার খুব ভয় হয় মা, এত সুখ আমার কপালে সোইবে তো।

মাগো তুমি মরে যাবার পরে বড় আপু আমাকে কখনো বুঝতে দেইনি আমার মা নেই। বুক দিয়ে আগলে রেখেছে একদিকে বোনের স্নেহ অন্যদিয়ে মায়ের ভালোবাস আপু একাই আমাকে দিয়েছে। আর এখন আদনান একটা সুখের স্বর্গ উপহার দিয়েছে ও আমাকে অনেক ভালোবাসে।

জানো মা আমার মেয়েটা বড় আপুকে ছাড়া কিছুই বোঝেনা। সবাই ভবে আমি না বড় আপু হিয়ার মা। আমি যদি মরেও যাই আমার কোন দুঃখ থাকবে না, কোন চিন্তা থাকবে না বড় আপা কোন দিন মায়ের অভাব বুঝতে দেবেনা। আমাকে যেমন ভালোবাস দিয়ে আগলে রাখেছে হিয়াকেও একি ভাবে রাখবে।

মাগো আমি অনুসূচনা শেষ হয়ে যাচ্ছি। আমি রাগ হয়ে বাবাকে বলেছিলাম মৃত্যুর পরেও বাবার মুখ দেখবোনা। আল্লাহ সত্যি আমার মনের আসা পুরোন করেছে। আমি মৃত্যু আগে সত্যি বাবার মুখতা দেখতে পারিনি।

সিঙ্গাপুরে দুই সপ্তাহের জন্য কনফারেন্স গিয়েছিলাম।

আমি অনেক বেশি অন্যায় করেছি বাবার সাথে শত হলেও সে আমার জন্মদাতা পিতা ছিলো। তবে মনে একটাই সান্তনা আপুরা কেউ মুখ ফিরিয়ে নেয়নি।

মা আমি তোমার কাছে পারমিশন চাই গত দুই বছর হলো বাবা মারা গেছে আমি একবার ও বাবার কবর জিয়ারত করতে যাইনি। আমি যেতে চাই।

খন্দকার বাড়ির আগের ধন জৌলাশ আর নাই। এই বিশটা বছরে অনেক পরিরর্তন ঘটেছে। খন্দকার বাড়ি এখন অন্ধকার বাড়িতে পরিনত হয়েছে।

বাবা কত দিন দেখিনা তোমায়। কেউ বলেনা মানিক কোথায় আমার বুকে আয়।
দেখতে দেখতে কখন যে বিশটি বছর পার হয়ে গেলো। গত বিশটি বছর একবারের জন্য আদর পাইনি বাবাকে বাবা বলে ডাকতে পারিনি, কখনো বাবার পরম স্নেহের হাতটি আমায় মাথায় বুলিয়ে দিতে দেখিনি।একবারের জন্য বলতে পারিনি আমিও বাবা তোমার সাথে সুখ, দুঃখের ভাগিদার হতে চাই। আমার সামনে যখন কোন বন্ধুদের তার বাবার গল্প করতে শুনি তখন বুকের এক কোনে কেমন যেন ব্যথা অনুভব হয়। ব্যথাটা কেমন বুঝতে চাই কিন্তু পারিনা বাবা।

কোনটা বাবার কবর চেনা যাচ্ছে না। কবরে উপর ঘাস লতাপাতা হয়ে ভরে গেছে। কবরের উপরে গরু,ছাগল ঘাস খাচ্ছে। বাবা তোমাত বংশের প্রদীব কোথায় যার জন্য এত কিছু ঘটে গেলো। যার জন্য তুমি এত স্বার্থপর বনে গেলে।

তোমার ছেলে,তোমার বংশ প্রদীপ কি তোমার মান সম্মান ধোরে রাখতে পেরেছে বাবা..?

খোঁজ নিয়ে জানলাম। ইটের ভাটাটা তোমার শালারা দখল করে নিয়েছে। রাইসমিলটা ম্যানেজার চাচা কিনে নিয়েছে। তোমার নামের জমি জমা কিচ্ছু নেই সব তোমার গুনধর ছেলে বিক্রি করে জুয়া খেলে, নেশা করে, শেষ করে ফেলেছে,এখন যাত্রাপালার মেয়েদের নিয়ে পরে থাকে। এখন শুধু এই বাড়িটাই সম্বল কবে যেন এটাও বিক্রি করে দেয়। তুমি নিজের চোখে দেখ গিয়েছিলে তোমার ছেলের অধঃপতন। ঐ ছেলের জন্য তুমি হার্ড এট্যাক করলে। ছেলে ছেলে করে তুমি আমাদেরকে পর করে দিলে আর সেই ছেলেই তোমাকে মৃত্যু দিকে ঠেলে।

শুনেছি ছোট মায়ের ক্যান্সার হয়েছে। বিনাচিকিৎসা মৃত্যু পথযাত্রী তাকেও বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে তোমাদের ছেলে। ছোট মা তার ভাইদের কাছে গিয়েছিল তারাও দূর দূর করে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে।কেউ জানেনা এখন কোথায় আছে।

তোমার মেয়েরা না থাকলে হয়তো তোমার ছোট মায়ের মত করুন পরিনতি হতো। আপুরা তোমার চিকিৎসা, সেবা যত্ন সবকিছু করেছিলো। মনে শুধু এতটুকু সান্তনা মৃত্যু আগে তুমি তোমার মেয়েদের ভালবাসা পেয়ে মৃত্যুবরন করেছিলে।

বাবা তোমার তো নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করা উচিত ছিলো কারন আমার নবীজির ও চারটা কন্য ছিলো আর তোমার ও চারটা কন্য সন্তান ছিলো। বাবা তুমি আমার নবীজির আদর্শ মেনে চলনি। তুমি যদি নবী করিম (সাঃ) এর আদর্শ মেনে চলতে তাইলে জীবন এমন হতো না।

বাবা তোমার মান সম্মান ধুলায় মেশেনি। তোমার বংশ তোমার ছেলে রক্ষা করতে না পারলেও তোমার মেয়েরা পেরেছে। মানুষ তোমার মেয়ের জন্য তোমাকে সম্মান করেবে। এখন দ্বায়িত্ব বাবার আগের সম্মান ফিরিয়ে দেওয়া।লোকাজন ঠিক করেছি বাবার বন্ধ হওয়া মসজিদ, মাদ্রাসা ঠিক করে পুনোরায় আবার চালু করবো।

যদি সঠিক ভাবে গোড়তে পারে তাহলে ছেলে আর মেয়ে কি দু’জনে সমান।মেয়েরাও পারে বাবা মায়ের সম্মান বৃদ্ধি করতে। বুড়ো বয়সে বাবা-মায়ের চলার পথে লাঠি হতে।

মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেস্ত কত বড় সম্মানের আসনে আল্লাহ নারীদের কে দিয়েছে। আমার মানুষরাই নারীদের সম্মান করতে জানিনা।

সাম্যের গান গাই
কাজী নজরুল ইসলাম

আমার চক্ষে পুরুষ- রমনী কোন ভেদাভেদ নাই। বিশ্বের যা কিছু মহান সৃস্টি চির কল্যান কর অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।

বিশ্বে যা কিছু এল পাপ-তাপ বেদনা অশ্রুবারি
অর্ধেক তার আনিয়াহে নর, অর্ধেক তার নারী।নরকুন্ড বলিয়া কে তোমা করে নারী হয়ে জ্ঞান?তরে বলে আদি পাপি নারী নহে সে যে নর শয়তান।অথবা পাপ যে -শয়তান যে- নর নহে নারী হনে ক্লীব সে, তাই সে নর ও নারীতে সমান মিশিয়ে রহে।

এ বিশ্বে যত ফুটিয়াছে ফুল, ফলিয়াছে যত ফল।নারী দিল তাহে রুপ- রশ- মধু- গন্ধ নির্মল। তাজমহলের পাথর দেখেছো, দেখিয়াছো তার প্রান। অন্তরে তার মোমতাজ নারী – বাহিরেতে শা-জাহান।

বাবার বিয়ে সব গল্প পড়ুন

   ******সমাপ্ত****-*

খুব তাড়াতাড়ি আসবো নতুন গল্প নিয়ে।আসা করি পাশে থাকবেন।

admin

Recent Posts

ফেসবুক থেকে ভিডিও ডাউনলোড করার উপায়

তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে সারা বিশ্বের যুবক-শিশু-বৃদ্ধ কম-বেশ ফেসবুকের সাথে পরিচিত রয়েছে। ২০১৭ সালে ফেসবুক বছরের প্রান্তিক আয় ঘোষণার সময়…

1 সপ্তাহ ago

বিবাহের জন্য পাত্রী নির্বাচন করবেন যেভাবে

মানব জাতির মধ্যে পৃথিবীতে সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পর্ক হলো স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক,এর চেয়ে উত্তম সম্পর্ক পৃথিবীতে আর আসবে না।এবং পৃথিবীতে সর্বপ্রথম সম্পর্কও স্বামী-স্ত্রীর(আদম-হাওয়ার)।রাসুল(সাঃ)…

2 সপ্তাহ ago

এলার্জি থেকে চিরতরে মুক্তি পাওয়ার উপায়।। ১০০% কার্যকরী।।

এলার্জি!পৃথিবীর সকল মানুষের মধ্যেই কম-বেশ এলার্জি অবশ্যই থাকে।কারো শরীরে বেশি কারো শরীরে কম পার্থক্য এইখানেই।তবে অতিরিক্ত এলার্জি কতটুকু কষ্টকর তা…

2 সপ্তাহ ago

তাড়াতাড়ি ঘুম আসার সহজ উপায়।। ১০০% কার্যকরী।।

ঘুম!পৃথিবীতে সবচেয়ে শান্তি ও আরামদায়ক মুহূর্ত হচ্ছে ঘুম।ঘুম আমাদেরকে পরবর্তী দিনের কাজ-কর্ম করার জন্য চাঙা করে তুলে।সারাদিন কাজ-কর্ম ও খেলাধুলা…

2 সপ্তাহ ago

হস্তমৈথুনের উপকারিতা ও অপকারিতা এবং মুক্তির উপায়

হস্তমৈথুন (Masturbation) কি? হস্তমৈথুন বা স্বমেহন (Masturbation)  হচ্ছে এক ধরণের বিকৃত যৌনক্রিয়া।যা শয্যাসঙ্গিনী/সঙ্গী ছাড়া হাত কিংবা সেক্সটয় এর মাধ্যমে নারী/পুরুষ যৌনসুখ উপভোগ করার চেষ্টা করে…

2 সপ্তাহ ago

বাবার বিয়ে(০৯ পর্ব)নুসরাত মাহিন

গল্পঃবাবার বিয়ে(পর্বঃ০৯) লেখাঃনুসরাত মাহিন আপুর কাছে সুনলাম বাবার একটা মেয়ে হয়েছে কিন্তু প্রতিবন্ধী। শুনে খুব খারাপ লাগলো বাবা, ছোট মা…

2 সপ্তাহ ago