বাবার বিয়ে(০৮ পর্ব)নুসরাত মাহিন

গল্পঃবাবার বিয়ে(পর্বঃ০৮)

লেখাঃনুসরাত মাহিন

মাথার উপর কারো হাতের স্পর্শ পেয়ে ঘুম ভেঙে গোলো তকিয়ে দেখি বড় আপু চোখ দুইটা লাল করে আমার পাশে বসে আছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে এতক্ষন কেঁদেছে।

— ভোর বেলা সমস্থ বাড়ি তোকে কোথায় খুঁজে পাচ্ছিলাম না। এখানে এসে দেখি মায়ের কবর এর উপর ঘুমিয়ে আছিস।

— মায়ের বুকে মাথা না দিলে ঘুম আসেন। মাকে এখানে একা রেখে ঘরের মধ্যে শান্তি পাচ্ছিলাম না। মা একা কেনো মরে গেলো আমাকে সাথে করে নিয়ে যেতো তাহলে দু’জন এক কবরে, এক সাথে থাকতে পারতাম।
মাকে ছাড়া থাকবো কিভাবে আপু।

আপু টানদিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে, আমিও কাঁদছি।

— জানিস নিশি তোর যেদিন জন্মহয় আমি প্রথম তোকে দেখি। তুই কান্না করছিলি আমি চাচির কাছ থেকে তোকে কোলে নেই কপালে মুখে চুমু দেই। তুই কান্না থামিয়ে আমার দিকে আধো আধো খোলা চোখে মুখের দিকে তাকিয়ে দুই হাত নারিয়ে সেকি খুসি। আমরা তিন বোন আর মা ছাড়া তোকে দেখে কেউ খুশি হয়নি। সবাই ছেলের আসা করেছিল কিন্তু জন্ম হলো মেয়ে তাও আবার গায়ের রং কালো। ফুফুরা বাবার সামনে বসে মাকে কত কথা শোনালো।

ভাবছি পোলা হইবে পোলাতো হইলো না জন্ম নিছে একটা কালা মাইয়া। আগের তিনডা তো ফর্শা সুন্দর ছিলো এইডা দেখি রাইতের লাহান কালা হইছে। ভাইজান তুমি সাদা, ভাবির গায়ের রং সাদা এইডা আইলো কৈর থেক্কা। দেইখা তো মনে হয়না তোমার বাচ্চা। ফুফুদের কথা শুনে বাবা তিন দিন বাসায় আসেনি। মামারা অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে বাবাকে নিয়ে আসে কিন্তু বাবার মনের মধ্যে সন্দেহ থেকে যায়। মায়ের সাথে খুব একটা ভালো ব্যবহার করতো না। আমার চাচা, ফুফুরা কখন তোর সাথে ভালো আচারন করেনি।

আমি তোর নাম রাখি শারমিন নিশি। নিশিতে তোর জন্ম তাই নাম নিশি রাখলাম। গ্রামে শ্যামবর্ণ কে কালো হিসাবে ধরে এখানে কালো মানুষের কোন মূল্য নাই।
বাবা তোর নামে আকিকা দেবে না। আমি আমার মাটির ব্যাংক ভেঙে ফেলি। তেইশত টাকা ছিলো। মার কাছে টাকাগুলো দিয়ে বলেছিলাম আকিকা দিতে। মা আমাকে কাছে টেনে নিয়ে বলেছিল আমি না থেকলে তুই ওরে আগলিয়ে রাখতে পারবি এখন থেকে আমার কোন চিন্তা নাই। ওই দিন আমার টাকা সাথে মায়ের কাছে জমানো টাকা মিলিয়ে ছোট মামাকে দিয়ে একটা খাসি কিনে আনিয়ে তোর আকিকার ব্যবস্থা করি।

তোর কপালে কাজলের টিপ দিলে চাচা,ফুফুরা খুব হাসাহাসি করতো বলতো অর কপালে টিপ দিছিস কেন ঐ কাইল্লা মাইয়ার দিকে কেউ নজর দেবেনা।অথচ আমাদের চার বোনের মধ্যে তোর চেহারা বেশি ভালো, মিষ্টি ভাব বেশিছিলো শুধু শ্যামলা দেখে মাকে কত কথা শোনাতো।

তুই বড় হতে লাগলি চেহারা আর সুন্দর হতে লাগলো। বাবাকে দেখলেই হেসে দিয়ে দুইহাত বারিয়ে দিতি কোলে নেয়ার জন্য। আস্তে আস্তে বাবা ও তোর প্রতি ভালোবাসা সৃস্টি হতে লাগলো। এর পর কেউ কিছু বললে বাবাই উত্তর দিতো।

ছোটবেলায় তুই রাগ করলে আমি তোর কাছে গিয়ে বলতাম আমার দাদাইটা কোই রে ওরে আমার পাখিটা রাগ হইছে। হাত বারিয়ে যখন বলতাম

আয়য়ে কাছে সোনা মনি, আয়রে কাছে জান, তুইযে আমার চোখের তারা, তুইযে আমার প্রান। তোকে নিয়ে গোড়বো আমি সুখেরি জীবন। সাথে সাথে লাফ দিয়ে কোলে আসতি।

মা নেই, তোর বোনরা কি মরে গেছে। ছোট বেলায় তোকে যেমন আগলে রাখতাম এখন থেকে আমি বুক দিয়ে আগলে রাখবো তোকে। মায়ের অভাব কি বুঝতেই দেবো না।

আপু জোর করে ঘরে এনে গোছল করিয়ে নাস্তা খায়িয়ে দিলো।

আজ তিন দিন মা নেই। মসজিদে মিলাদের ব্যবস্থা করা হয়েছে আর বাসাতে এতিম, গরিবদের খাবারের ব্যবস্থা করেছে।
আমিও আজকে এতিম দের সাথে খাবার খাবো ওদের মাঝে বসে পরলাম। ভেবেছিলাম আপুরা রাগ হবে আপুরা দেখি আমার পাশে বসে খাওয়া শুরু করেছে।

আমাকে নিয়ে টানাটানি শুরু হয়ে গেলো। মামারা চাচ্ছে আমাকে তাদের কাছে রাখবে আপুরা কেউ রাজিনা। মেঝো তার কাছে নিয়ে যাবে কিন্তু বড় আপুর এক কথা আমাকে কারো কাছে দেবেনা আপুর কাছে রাখবে।
আমি পড়েছি মহা বিপদে কিছুই মাথায় কাজ করছে না চুপ থাকা বুদ্ধিমানের কাজ যা আছে কপালে।

ডিসিশন হল আমার ঠিকানা এখন বড় আপুর বাসা। মাঝো আপু কাছে থাকবে জমিলা খালা ওনার আপন বলতে আমারা ছাড়া কেউ নাই। বাড়ি দেখাসুনা করবে মুক্তা আপা আর সিদ্দক ভাই ওরা এখানে থাকবে।

আমার তো এখানে মাকে একা রেখে যেতে ইচ্ছে করছে না। মাগো তুমি বেঁচে থাকলে আমাকে দোটানা মধ্যে পরতে হতো না।

শুধু একটা মানুষ নাই এ কদিনে কত কি ঘটেগেলো।

মায়ের অভাব আস্তে আস্তে বুঝতে পারছি।

বড় দুলাভাই কলেজ থাকে আমার বদলির সব ব্যবস্থা করে ফেললো।

খুলনা আসার আগে মায়ের কবরের সামনে দোয়া পড়ে কবর টা জিয়ারত করে আসলাম। আবার কবে গ্রামে আসবো তা জানিনা।

খুলনা নিয়ে সিটি কলেজে ভর্তি করিয়ে দিলো।রেজাল্ট ভালো থাকার কারনে ভর্তি হতে কোন বেগ পেতে হইনি।

গ্রামের কাদামাটি জীবনের ইতি ঘটিয়ে শুরু হলো আমার ইট-পাথরের শহুরে জীবন। আপু খুব পরিপাটি করে আমার রুমটা সাজিয়েছে সব কিছু নতুন জিনিসপত্র এমন কি পানি খাবার গ্লাসটাও।

আজকে আমার এই কলেজে প্রথম ক্লাস আপু, দুলাভাই সাথে করে নিয়ে গেছে। গ্রাম থেকে এসেছি শুনে সবাই একটু ভ্রুকুচকে তাকিয়ে ছিলো।

স্যার যখন জিজ্ঞেস করলো ম্যাট্রিক এ রেজাল্ট কি..??

আমার রেজাল্ট শুনে সবাই অনেক অবাক হয়েছিল। ওদের ধারনা ছিলো গ্রামের স্টুডেন্টরা ভালো রেজাল্ট করতে পারেনা। এর মধ্যে কয় একজনের সাথে আমার ভালো বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে।
ক্লাসের বেলি নামের মেয়েটা আমাকে খুব একটা পছন্দ করে না আমার উপর রেগে আছে কারন ওর ঘনিষ্ঠ বন্ধুগুলো আমার মিসে। আমি যে বেঞ্চিতে বসলে বেলি ওই বেঞ্চে বসে না জানিনা কেনো।

দিনশেষে রাতে বেলা মায়ের কথা খুব মনেপড়ে মুখটা চোখোর সামনে ভেসে আসে।

আমাদের কলেজে একজন বয়স্ক মহিলা আসে বাদাম বিক্রি করতে। আমরা খালাকে পছন্দ করি উনার কাছ থেকে বাদাম কিনে খাই কিন্তু বেলি উনাকে একদমি সহ্য করতে পারেনা। খালার কাছ থেকে কেনা বাদাম খাওয়া তো দূরে থাক ছোঁয় ও না। তিথি, জারা ওদের কারনে বেলি আমার সাথে মিসলেও আমার থেকে দুহাত দূরে থাকে।

বাহিরে প্রচন্ড বৃষ্টি ক্লাসে বসে আছি। স্টুডেন্ট কম থাকায় ক্লাস হয়নি তাই সবাই মিলে ডিসিশন নিলাম ফুচকা খেতে যাবো

বৃষ্টির কারনে রাস্তা পিচ্ছল হয়ে আছে। রাস্তার সাইড দিয়ে আমরা পাঁচজন হেটে যাচ্ছি। হাটার সময় বেলি স্লিপ খেয়ে পড়ে যাওয়ার সময় আমি ওর হাতটা ধরে ফেলি। বেলী এক ঝাটকা দিয়ে আমার হাতটা সরিয়ে ফেললো। সবাই ওর কান্ড দেখে অবাক। আমি কেন ওর হাত ধরেছি এখন ওর শরীর ঘিন ঘিন লাকছে। আমার কালো হাত দিয়ে কেনো ওকে স্পর্শ করেছি বেলি সাতদিনেও নাকি ওর হাত দিয়ে কিছু খেতে পারবেনা। আমি কিছুক্ষন ওর মুখের দিকে তকিয়ে ছিলাম। বেলি কালো মানুষদের অনেক ঘৃনা করে। এতদিনে বুঝলাম আসল কাহীনি কলেজের খালাকে কেন পছন্দ করতো না, কেন ওনার কাছ থেকে কেনা বাদাম খেতোন শুধু কালো বলে। খালার গায়ের রং আমার মত কালো।
বেলি যে অনেক ফর্শা তাওনা উজ্জ্বল ফর্সা। বেলির কান্ডকারখানা দেখা সবাই হতবাগ। দোকান থেকে সাবান কিনে হাত ধুচ্ছে।

খুব কষ্ট লাকছে কালো মানুষ কি মানুষ না। মানুষ হল আসরাফুল মাকলুকাত পৃথিবীর সেরা জীব কিন্তু মানুষেত আচরন যদি পশুদের মত হয় তাকে কি মানুষ বলা যায়
গায়ের রং কালো দেখে যারা মানুষকে অসম্মান করে, ভালোবাসতে জানে না। তাদের মত মানুষ কে দেখলে আমার ও ঘৃনা লাগে।

আজ মায়ের কথা খুব মনে পড়ছে। কই আমি কালো ছিলাম আমার মায়ের তো কখন আমাকে ঘৃনা লাগেনি। কত হাজার চুমু খেয়েছে মুখে। আমি ছিলাম মায়ের কাছে পৃথিবীর সব থেকে সুন্দর মানুষ। মা আমার মুখের দিকে সব সময় তাকিয়ে থাকতো। মা নাকি বাগানে ফুটে থাকা টকটকে লাল গোলাপের দিকে তাকিয়ে আছে। সন্তানের প্রতি মায়ের ভালোবাসা কি কালো / ফর্শাতে বিচার করে।

মন খারাপ করে বাসায় চলে আসলাম। এসে দেখি চাচা এসেছে। আপুর কাছে শুনলাম বাবার একটা মেয়ে হয়েছে।

চলবে..

বাবার বিয়ের সব গল্প পড়ুন

admin

Recent Posts

ফেসবুক থেকে ভিডিও ডাউনলোড করার উপায়

তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে সারা বিশ্বের যুবক-শিশু-বৃদ্ধ কম-বেশ ফেসবুকের সাথে পরিচিত রয়েছে। ২০১৭ সালে ফেসবুক বছরের প্রান্তিক আয় ঘোষণার সময়…

1 সপ্তাহ ago

বিবাহের জন্য পাত্রী নির্বাচন করবেন যেভাবে

মানব জাতির মধ্যে পৃথিবীতে সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পর্ক হলো স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক,এর চেয়ে উত্তম সম্পর্ক পৃথিবীতে আর আসবে না।এবং পৃথিবীতে সর্বপ্রথম সম্পর্কও স্বামী-স্ত্রীর(আদম-হাওয়ার)।রাসুল(সাঃ)…

2 সপ্তাহ ago

এলার্জি থেকে চিরতরে মুক্তি পাওয়ার উপায়।। ১০০% কার্যকরী।।

এলার্জি!পৃথিবীর সকল মানুষের মধ্যেই কম-বেশ এলার্জি অবশ্যই থাকে।কারো শরীরে বেশি কারো শরীরে কম পার্থক্য এইখানেই।তবে অতিরিক্ত এলার্জি কতটুকু কষ্টকর তা…

2 সপ্তাহ ago

তাড়াতাড়ি ঘুম আসার সহজ উপায়।। ১০০% কার্যকরী।।

ঘুম!পৃথিবীতে সবচেয়ে শান্তি ও আরামদায়ক মুহূর্ত হচ্ছে ঘুম।ঘুম আমাদেরকে পরবর্তী দিনের কাজ-কর্ম করার জন্য চাঙা করে তুলে।সারাদিন কাজ-কর্ম ও খেলাধুলা…

2 সপ্তাহ ago

হস্তমৈথুনের উপকারিতা ও অপকারিতা এবং মুক্তির উপায়

হস্তমৈথুন (Masturbation) কি? হস্তমৈথুন বা স্বমেহন (Masturbation)  হচ্ছে এক ধরণের বিকৃত যৌনক্রিয়া।যা শয্যাসঙ্গিনী/সঙ্গী ছাড়া হাত কিংবা সেক্সটয় এর মাধ্যমে নারী/পুরুষ যৌনসুখ উপভোগ করার চেষ্টা করে…

2 সপ্তাহ ago

বাবার বিয়ে(শেষ পর্ব)নুসরাত মাহিন

গল্পঃবাবার বিয়ে(পর্বঃ১০) লেখাঃনুসরাত মাহিন মধুর আমার মায়ের হাসি চাঁদের মুখে ঝরে মাকে মনে পরে আমার মাকে মনে পরে। দেখতে দেখতে…

2 সপ্তাহ ago